অর্থনীতির প্রধান ছয় সূচক এখনও ঊর্ধ্বমুখী

অর্থনীতির প্রধান ছয় সূচক এখনও ঊর্ধ্বমুখী

নিউজ ডেস্ক:
করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব থাকার পরও দেশের অর্থনীতির প্রধান ছয়টি সূচক এখনও ঊর্ধ্বমুখী ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। প্রবাসী আয়সহ অর্থনীতির বেশ কয়েকটি সূচক এরই মধ্যে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। তবে অর্থনীতির প্রধান সূচক বিনিয়োগসহ অন্তত ছয়টি সূচক নিম্নমুখি ধারায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঊর্ধ্বমুখী ধারায় প্রবাহিত হওয়া সূচকগুলোর মধ্যে রয়েছে:  প্রবাসী আয় বেড়েই চলেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েই চলেছে, পুঁজিবাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে, সচল হয়েছে আমদানি বাণিজ্য, মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা বেড়েছে। অর্থাৎ কম মুনাফার পরও একদিকে ব্যাংকে জমানো আমানত বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে মানুষ এখনও ভালো টাকা মুনাফা পাচ্ছে। ছয়. কারেন্ট একাউন্ট ব্যালেন্স বেড়েছে।

নিম্নমুখি ধারায় প্রবাহিত হওয়া সূচকগুলোর মধ্যে রয়েছে:   বিনিয়োগ শূন্যতা, নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না, মানুষের আয় কমে যাচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছে, বেকার সংখ্যা বাড়ছে, রফতানি আয় নিম্নমুখি,  রাজস্ব আয়ে ঘাটতি, শিল্পের জন্য মেশিনারিজ এলসি হচ্ছে না, খেলাপি বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে।

অবশ্য দেশের অর্থনীতি সঠিক পথে রয়েছে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। শিগগির তা ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী। কারণ ব্যাখ্যা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, করোনা মহামারি থেকে উত্তরণে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো যথেষ্ট সময়োপযোগী ছিল। বুধবার(২০ জানুয়ারি) জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের বাজেটের প্রথম প্রান্তিকের বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে এ সব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অগ্রগতির যে চিত্র আমরা দেখলাম, তা থেকে নির্দ্বিধায় বলা যায় আমরা সঠিক পথে রয়েছি। তথ্য-উপাত্ত ও উদাহরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধি, রফতানিতে প্রবৃদ্ধি, প্রবাসী আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মুদ্রা বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতির নিম্নগতি নির্দেশ করে যে আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর দিকে এগিয়ে চলেছি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতির যেসব সূচক ভালো অবস্থায় নেই, সেগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ অন্যতম। এই বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হলে একসঙ্গে সবকটি সূচকই ঘুরে দাঁড়াবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষক ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যখন বিনিয়োগের খরা কেটে যাবে, তখন নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তখন  মানুষের আয় বাড়বে। মানুষের  চাকরি হবে। বেকার সংখ্যা কমে যাবে। শিল্পের জন্য মেশিনারিজ এলসি হওয়া শুরু হবে।  রফতানি আয় বাড়তে থাকবে।  রাজস্ব আয়েও এর প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, দ্বিতীয় ধাপের করোনায় যদি লকডাউনে যেতে না হয়, তাহলে অর্থনীতির সব সূচকই গতিশীল হবে। প্রবাসী আয়সহ অর্থনীতির বেশ কয়েকটি সূচক এরই মধ্যে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছুদিন পরই দেখা যাবে, সবাই বিনিয়োগে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। করোনার কারণে যেসব কাজ ঝিমিয়ে পড়েছিল, সেগুলোও সচল হবে।

এদিকে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলছেন, আগামী মার্চ পর্যন্ত এভাবেই যাবে। তবে আগামী জুলাই- আগস্টের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত দেশগুলো থেকে কেনাকাটা, ভ্রমণ, ভোগ ব্যয় বাড়তে থাকবে। তখন আমাদের রফতানি ও শ্রম বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ:
করোনাকালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন উচ্চতায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩২ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারিতে সেই রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৪২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স:
করোনা মহামারিতেও রেমিট্যান্স আসছে আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসে ২০৫ কোটি ৬ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী,  জুলাই-ডিসেম্বর এই ছয় মাসে দেশে মোট এক হাজার ২৯৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। করোনাভাইরাস মহামারির মাঝেই অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ।

সচল হয়েছে আমদানি বাণিজ্য :
শিল্পের জন্য মেশিনারিজ আমদানি না হলেও খাদ্য পণ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে গত নভেম্বর মাসে আমদানিতে প্রায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের চেয়ে ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে( জুলাই- নভেম্বর)  আমদানি কমেছে ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

শক্তিশালী হয়েছে শেয়ার বাজার:
দেশের প্রধান শেয়ার বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধনে একের পর এক রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে।  ডিএসইতে বাজার মূলধন  পাঁচ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়েছে। যদিও ছয় মাস আগে হতাশার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের শেয়ার বাজার। গত জুলাই মাসের শুরুতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ১১ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। বর্তমানে সেই বাজার টেকসই বাজারে রূপ নিচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে টেকসই হবে পুঁজিবাজার।

সঞ্চয় বাড়ছে মানুষের :
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে ব্যয় বাড়লেও মানুষ আগের চেয়ে সঞ্চয় করছে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিদায়ী ২০২০ সালের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকগুলোয় আমানত বেড়েছে ৯৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (জুলাই থেকে নভেম্বর) পর্যন্ত মানুষ ১৯ হাজার ৪৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। আর গত ছয় মাসে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।

কমে এসেছে বাণিজ্য ঘাটতি:
গত অর্থবছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের (৫৭২ কোটি ৯০ লাখ ডলার) বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে অর্থবছর শেষ করেছিল দেশ। চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) জুলাই-অক্টোবর সময়ে তা কমে ৩২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। এই বাণিজ্য ঘাটতি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার কম।

প্রসঙ্গত,  দুর্দান্ত গতিতে বাংলাদেশের এগিয়ে চলা শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্নআয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে ২০১৫ সালেই। জাতিসংঘের হিসাবে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের সিঁড়িতে পা দেবে ২০২৪ সালে।

তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা গত কয়েক বছর ধরেই হতাশার কথা শুনিয়ে আসছেন। এদিকে করোনাকালের আগে থেকেই দেশে বিনিয়োগে হতাশা বিরাজ করছে। করোনাকালে সেই হতাশা আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। যা বিগত যে কোনও সময়ের চেয়ে কম। ব্যাংক কর্মকর্তারা এই প্রবৃদ্ধিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি বলছেন। অর্থাৎ গত এক বছরে সবগুলো ব্যাংক মিলে এক লাখ কোটি টাকাও ঋণ বিতরণ করতে পারেনি। ২০১৯ সালের নভেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। ২০২০ সালের নভেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ২০ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত এক বছরে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ৮৫ হাজার কোটি টাকা।  প্রসঙ্গত,  ২০০৯-১০ অর্থবছর শেষে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ শতাংশের বেশি। বছরওয়ারি হিসেবে, এরপর তা সব সময়ই ১০ শতাংশের বেশি ছিল। এমনকি ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

বেসরকারি খাতে কম ঋণ মানে হলো বিনিয়োগ কমে যাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য কমে যাওয়া। শিল্পায়ন কমে যাওয়া। অর্থাৎ কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের আয় কমে যাওয়া।

রফতানিতে ধস:
মহামারি করোনার প্রথম ধাক্কায় দেশের অর্থনীতি ঠিক থাকলেও করোনার দ্বিতীয় ধাপে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের  অন্যতম প্রধান  খাত রফতানিতে ধস নেমেছে। করোনার দ্বিতীয় ধাপের প্রভাবে ইউরোপের রফতানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে আবার হোঁচট খেয়েছে রফতানি। করোনাভাইরাস মহামারিকালে বিদায়ী বছরের শেষ মাসে পণ্য রফতানি থেকে ৩৩১ কোটি ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের চেয়ে ৬ দশমিক ১১ শতাংশ কম। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। ডিসেম্বরের এই ধসের ধাক্কা ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেও (জুলাই-ডিসেম্বর) লেগেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে এই অর্থবছরে একই সময়ে রফতানি কমেছে শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ।

এদিকে করোনাভাইরাস মহামারির অভিঘাতে তৈরি পোশাক রফতানি এবং রেমিট্যান্স কমে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব ব্যাংক। বিশ্ব ব্যাংকের অর্ধ-বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক আউটলুকের’ জানুয়ারি সংখ্যায় এই ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বো হয়েছে, মহামারীর কারণে বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ রফতানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পোষ্টটি প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করতে পারেন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!