অর্থ আদালত স্টাডি রুম (পর্ব-১) বিষয়: দলিল পরিচিতি

অর্থ আদালত স্টাডি রুম (পর্ব-১) বিষয়: দলিল পরিচিতি

স্টাডি রুম ডেস্ক:
সম্পত্তি  হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এর ৫৪ ধারা অনুসারে, বিক্রয় হইল পরিশোধিত মূল্যের বা পরিশোধ করিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বা আংশিক পরিশোধিত এবং আংশিক পরিশোধ করিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মূল্যের বিনিময়ে মালিকানা হস্তান্তর। এসব ক্রয়-বিক্রয় সংগঠন করতে দলিলের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। নিচে বিভিন্ন রকমের দলিল সম্পর্কে আলোচনা করা হলঃ-

বায়নাপত্র দলিল বা বিক্রয়চুক্তি দলিলঃ কোন সম্পত্তি স্থিরকৃত শর্তে এবং সাব্যস্তকৃত মূল্যের আংশিক প্রাপ্তির পর উক্ত সম্পত্তি হস্তান্তর বিষয়ে পক্ষগণের মধ্যে যে দলিল সম্পাদিত হয়, তাকে বায়নাপত্র দলিল বলে। রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এর ১৭ক (২) ধারা অনুসারে, বায়নাপত্র দলিল সম্পাদনের ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশনের জন্য দাখিল করতে হয়।

সাফ কবলা দলিলঃ পরিশোধিত বা আংশিক পরিশোধিত এবং আংশিক পরিশোধ করিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আর্থিক মূল্যের বিনিময়ে কোন সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর বিষয়ক দলিলকে সাফ কবলা দলিল বলে।

হেবার ঘোষণাপত্র দলিলঃ যে দলিলের মাধ্যমে ইসলামী শরীয়া মোতাবেক স্বামী ও স্ত্রী মধ্যে, পিতা-মাতা ও ছেলে-মেয়ের মধ্যে, দাদা-দাদি ও নাতি-নাতনির মধ্যে, নানা-নানী ও নাতি-নাতনির মধ্যে, সহোদর ভাইগণের মধ্যে, সহোদর বোনগনের মধ্যে এবং সহোদর ভাই ও বোনগনের মধ্যে বিনিময়ে কোন কিছু গ্রহণ না করে পূর্বের কোন সুনির্দিষ্ট সময়ে নূন্যতম দুইজন স্বাক্ষির উপস্থিতিতে মৌখিক ঘোষণার মাধ্যমে হস্তান্তরিত সম্পত্তির স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, তাকে হেবার ঘোষণা দলিল বলে।

দানের ঘোষণাপত্র দলিলঃ যে দলিলের মাধ্যমে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীগণের স্ব স্ব ব্যক্তিগত ধর্মীয় আইন মোতাবেক স্বামী ও স্ত্রী মধ্যে, পিতা-মাতা ও ছেলে-মেয়ের মধ্যে, দাদা-দাদি ও নাতি-নাতনির মধ্যে, নানা-নানী ও নাতি-নাতনির মধ্যে, সহোদর ভাইগণের মধ্যে, সহোদর বোনগনের মধ্যে এবং সহোদর ভাই ও বোনগনের মধ্যে বিনিময়ে কোন কিছু গ্রহণ না করে পূর্বের কোন সুনির্দিষ্ট সময়ে নূন্যতম দুইজন স্বাক্ষির উপস্থিতিতে মৌখিক ঘোষণার মাধ্যমে হস্তান্তরিত সম্পত্তির স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, তাকে “দান বিষয়ক ঘোষণা দলিল” বলে।

ভ্রম সংশোধন দলিলঃ যে দলিলের মাধ্যমে মূল দলিলের বস্তুগত বিষয়সমুহ অপরিবর্তিত রেখে পূর্ববর্তী দলিলের করণিক ভুল (clarical mistake) বা (bonafide mistake) সংশোধন করা হয়, তাকে ভ্রম সংশোধন দলিল বলে। এ দলিল মূল দলিলের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

দানপত্র দলিলঃ যে দলিলের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় এবং পণ ব্যতীত কোন সম্পত্তি অন্য কোন ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করেন, এবং দান গ্রহিতা বা তার পক্ষে অন্য কেউ উক্ত সম্পত্তি গ্রহন করেন, তবে তাকে দানপত্র দলিল বলে।

বিনিময় দলিলঃ যে দলিলের মাধ্যমে এক পক্ষের কোন জিনিসের মালিকানার পরিবর্তে অপর পক্ষের কোন জিনিসের মালিকানা  হস্তান্তর হয়, তাকে এওয়াজ বা বিনিময় দলিল বলে।

হেবা-বিল-এওয়াজ দলিলঃ যে দলিলের মাধ্যমে প্রতীকী কোন বস্তু যেমন- ধর্মীয় গ্রন্থ, জায়নামাজ, তসবিহ ইত্যাদির বিনিময়ে কোন সম্পত্তি দান করা হয়, তাকে হেবা-বিল-এওয়াজ দলিল বলে। হেবাবিল এওয়াজ এর ক্ষেত্রে হক শুফা বা অগ্রক্রয়ের অধিকারের উদ্ভব হয় না।

বন্ধক দলিলঃ যে দলিলের মাধ্যমে ঋণ হিসেবে অগ্রিম প্রদত্ত বা ভবিষ্যতে প্রদেয় অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ দেনা পরিশোধের নিশ্চয়তা অথবা আর্থিক দায় সৃষ্টি করিতে পারে এইরূপ কোন কার্য সম্পাদনের অঙ্গীকার হিসেবে নির্দিষ্ট স্বাবর সম্পত্তির স্বার্থ হস্তান্তর করা হয়, তাকে বন্ধক দলিল বলে।

বন্ধকমুক্তিঃ যে দলিলের মাধ্যমে গৃহীত ঋণের বিপরীতে বন্ধকী সম্পত্তির বন্ধক-গ্রহীতা বন্ধকী সম্পত্তি বন্ধক-দাতার বরাবরে হস্তান্তর করেন, তাকে বন্ধকমুক্তি দলিল বলে। বন্ধকদাতা কর্তৃক গৃহীত ঋণের সমুদয় অর্থ পরিশোধের পর বন্ধক গ্রহীতা এ ধরনের দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দেন।

বন্টননামা দলিলঃ যে দলিলের মাধ্যমে কোন সম্পত্তির অংশীদারগণ বা সহমালিকগণ নিজেদের মধ্যে উক্ত সম্পত্তি পৃথকভাবে ভাগ বা বন্টন করে নেয়, তাকে বন্টননামা দলিল বলে।

পাওয়ার অব অ্যাটর্নিঃ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এর ২ (১) ধারা অনুসারে, “পাওয়ার অব অ্যাটর্নি” অর্থ এমন কোন দলিল যাহার মাধ্যমে কোন ব্যক্তি তাহার পক্ষে উক্ত দলিলে বর্ণিত কার্য-সম্পাদনের জন্য আইনানুগভাবে অন্য কোন ব্যক্তির নিকট ক্ষমতা অর্পণ করেন।”

অনেকেই এই দলিলকে “আমমোক্তারনামা দলিল” বলে থাকেন। কিন্তু আইন ও বিধিমালার কোথাও “আমমোক্তারনামা” শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। তাই বাংলায় “পাওয়ার অব অ্যাটর্নি” কিংবা ইংরেজিতে “Power of Attorney” লেখাই যুক্তিযুক্ত।

মনে রাখবেন, এই দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করা যায় না। তাই দলিল গ্রহিতা তার নিজ নামে সম্পত্তি নামজারি বা খারিজ করতে পারবেন না। অর্থাৎ এই দলিলমূলে কেউ সম্পত্তির মালিকানা দাবী করতে পারেন না, দলিল গ্রহিতা কেবল দাতার পক্ষে দলিলে উল্লিখিত কার্য সম্পাদন করতে পারেন।

সাধারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নিঃ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এর ২ (৭) ধারা অনুসারে, “সাধারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি” অর্থ এই আইনের ২ (৪) ধারায় উল্লিখিত বিষয়ে সম্পাদিত অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ব্যতিত অন্য কোন বিষয়ে সম্পাদিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি।

বিশেষ পাওয়ার অব অ্যাটর্নিঃ কোন একক লেনদেন সংক্রান্ত এক বা একাধিক দলিল রেজিস্ট্রি করার একমাত্র উদ্দেশ্যে অথবা একটি বা একাধিক অনুরূপ দলিলের সম্পাদন স্বীকার করার ক্ষমতা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত দলিলকে বিশেষ পাওয়ার অব অ্যাটর্ণি দলিল বলে।

অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নিঃ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এর ২ (৪) ধারা অনুসারে, “অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি” অর্থ স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে, বিক্রয় চুক্তি সম্পাদনের বা ঋণ গ্রহণের বিপরীতে স্থাবর সম্পত্তির বন্ধক প্রদানের জন্য প্রদত্ত কোন পাওয়ার অব অ্যাটর্নি অথবা স্থাবর সম্পত্তির বিপরীতে পণ মূল্য গ্রহণের বিনিময়ে ভূমি উন্নয়নসহ উক্ত দলিল সম্পাদনের ক্ষমতা প্রদান সম্পর্কিত কোন পাওয়ার অব অ্যাটর্নি।

বহালকরণপত্রঃ পূর্বে রেজিস্ট্রিকৃত কোন দলিলের স্বত্বে বা মালিকানায় ত্রুটি থাকলে, পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যে দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রির মাধ্যমে পূর্বের দলিলকে স্বীকৃতি প্রদান করে, তাকে বহালকরণপত্র  বা ডিড অফ কনফার্মেশন বলে।

যেমন- কোন নাবালকের সম্পত্তি ঐ নাবালকের কল্যানের জন্য তার কোন অভিভাবক  বিক্রয় করলে,  ঐ নাবালক সাবালক হয়ে ‘বহালকরণ দলিল’ রেজিস্ট্রির মাধ্যমে তার অভিভাবকের সম্পাদিত পূর্বের দলিলটি বহাল করতে পারে।

পোষ্টটি প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করতে পারেন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!