কোটি টাকা খরচে কেনা রেলের নিম্নমানের ইঞ্জিন

কোটি টাকা খরচে কেনা রেলের নিম্নমানের ইঞ্জিন

নিউজ ডেস্ক:
রেলওয়ের ১০ ইঞ্জিন কেনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যাত্রীসেবার মান বাড়াতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কিনেছে রেলওয়ে। কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানি গত আগস্টে ইঞ্জিনগুলো সরবরাহ করে। তবে ইঞ্জিনগুলোয় দরপত্রের শর্তানুসারে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হয়নি। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এসব ইঞ্জিন।
হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন কোম্পানি সিসিআইসি যোগসাজশের মাধ্যমে এ অনিয়ম করেছে। যদিও এর সঙ্গে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে ইঞ্জিনগুলোর গুণগত মান খারাপ হলেও তা ফেরত না দিয়ে গ্রহণ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আর এ সুযোগে নিম্নমানের ইঞ্জিন সরবরাহ করেও চুক্তিমূল্যের ৬৫ শতাংশ ছাড় করিয়ে নিতে নানা ধরনের তদবির করছে হুন্দাই রোটেম। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রকল্পটির পিআইসি মিটিংয়ে এসব তথ্য উঠে আসে। এতে বলা হয়েছে, ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) কেনায় কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানির সঙ্গে ২০১৮ সালের ১৭ মে চুক্তি করে রেলওয়ে। এ চুক্তিমূল্য ছিল তিন কোটি ৭৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪০০ ডলার। ইঞ্জিনগুলো প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) করার জন্য সিসিআইসির সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। ইঞ্জিনগুলো জাহাজীকরণের আগে টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে বলে পিএসআই সার্টিফিকেট প্রদান করার কথা কোম্পানিটির।
যদিও সিসিআইসি কখনোই রেলওয়েকে অবহিত করেনি যে, চুক্তির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ইঞ্জিনগুলো তৈরি করা হচ্ছে না। বরং ইঞ্জিনগুলোতে নিম্নমানের ক্যাপিটাল কম্পোনেন্ট সংযোজন করার বিষয়টি তারা বরাবরই গোপন করে গেছে। এছাড়া রেলওয়ের একাধিক টিম হুন্দাই রোটেমের কারখানা পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিসিআইসি ইঞ্জিনগুলো ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোয় কখনোই রেলওয়ের টিমকে পরিদর্শনে নিয়ে যায়নি। সর্বশেষ যখন হুন্দাই রোটেম তাদের কারখানা পরিদর্শনের জন্য রেলওয়ের কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানায় তখন কভিড-১৯ কোরিয়ায় ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হয়ে পড়েছে। তাই ইঞ্জিনের গুণগত মান নিশ্চিতে রেলওয়েকে সিসিআইসির ওপর নির্ভর করতে হয়। এ সুযোগে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে ইঞ্জিনগুলো তৈরি করে হুন্দাই রোটেম।
বৈঠকের তথ্যমতে, ইঞ্জিনগুলোয় টিএ-১২ মডেলের অলটারনেটর সংযোজনের কথা ছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে টিএ-৯ মডেলের অলটারনেটর সংযোজন করা হয়েছে, যা পুরোনো মডেলের ও কম ক্ষমতার। এর ফলে ইঞ্জিনের অন্যান্য যন্ত্রাংশ, যেগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষমতার, সেগুলো সংযোজন করতে হয়। এতে ইঞ্জিনের গতি (হর্সপাওয়ার) ও ব্যাকআপ সিস্টেম কম ক্ষমতাসম্পন্ন হবে। যদিও ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশগুলো পরিবর্তন করার বিষয়ে এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি হুন্দাই রোটেম।
এদিকে গত ১২ আগস্ট ইঞ্জিনগুলোর জন্য সিসিআইসি দুই ধরনের পিএসআই সার্টিফিকেট জমা দেয়। এর মধ্যে একটিতে ইঞ্জিনগুলো বাংলাদেশে পৌঁছার পর টেস্টিং, ট্রায়াল রান ও কমিশনিং সন্তোষজনক হবে বলে শর্তও দেয়া হয়। কিন্তু পরে একই তারিখে এসব শর্ত বাদ দিয়ে আরেকটি পিএসআই সার্টিফিকেট দাখিল করে।
প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকটর কর্তৃক ইঞ্জিন জাহাজীকরণের আগে পিএসআই সার্টিফিকেট ইস্যু না করা এবং পরে একই তারিখে দুই ধরনের সার্টিফিকেট ইস্যু করা প্রভৃতি কারণে ওই সার্টিফিকেটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রকল্প পরিচালকের সন্দেহ তৈরি হয়। সে কারণে মালামালগুলো জাহাজ থেকে না নামিয়ে আবার ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ব্যাপারে মনস্থির করেন তিনি। কিন্তু লোকোমোটিভ সরবরাহকারী বা পিএসআই কোম্পানি বা অন্য কোনো উৎস থেকে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জেনে প্রকল্প পরিচালককে ডেকে নিয়ে মালামালগুলো খালাস করার জন্য মৌখিক নির্দেশ দেয়।
প্রকল্প পরিচালকের তরফ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, মালামাল খালাস করার সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনগুলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হুন্দাই রোটেম এলসির শর্তমতে ৬৫ শতাংশ চুক্তিমূল্য পরিশোধের শর্ত তুলবে। আর তা করা হলে অগ্রিম প্রদত্ত ২৫ শতাংশসহ (২৫+৬৫) ৯০ শতাংশ মূল্য পরিশোধ হয়ে যাবে। এতে ইঞ্জিনের বিচ্যুতি পাওয়া গেলেও তা সংশোধনের উপায় থাকবে না। পরে রেলপথমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ইঞ্জিনগুলো খালাস করে পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু চুক্তিমূল্যের ৬৫ শতাংশের অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।
এদিকে হুন্দাই রোটেম ও সিসিআইসির কাছে ইঞ্জিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অলটারনেটর-এর মডেল, স্পেসিফিকেশন প্রভৃতির তথ্য চাওয়া হলেও যথাসময়ে তারা তথ্য পাঠায়নি। ইঞ্জিনগুলো বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর সিসিআইসি চতুরতার আশ্রয় নিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর জানায় যে, সংযোজিত অলটারনেটরটি টিএ-৯ মডেলের, যা চুক্তির শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওই ত্রুটিগুলো সমাধা করার জন্য ইঞ্জিন সরবরাহকারীকে বারবার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু হুন্দাই রোটেম এসব ত্রুটি দূর না করে বিভিন্ন অপকৌশলে ৬৫ শতাংশ বিল তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এজন্য এডিবিসহ বিভিন্ন পক্ষে যোগাযোগও করে যাচ্ছে হুন্দাই রোটেম।
যদিও ইঞ্জিনগুলো কেনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলসির বৈধতার মেয়াদ ছিল গত ৬ নভেম্বর পর্যন্ত। বর্তমান অবস্থায় এলসির বৈধতা বৃদ্ধি করা মাত্রই ইঞ্জিনের ত্রুটি সমাধা না করে সরবরাহকারী চুক্তিমূল্যের ৬৫ শতাংশ তুলতে সক্ষম হবে। এ কারণে এলসির সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদে উভয় পক্ষের মধ্যে সমতা আনার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু হুন্দাই রোটেমের সম্মতি না পাওয়ায় এলসির মেয়াদ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়নি।
বৈঠকে আরও জানানো হয়, চুক্তিপত্র-বহির্ভূত তিনটি ক্যাপিটাল কম্পোনেন্টের ভিন্নতা আছে। এর মধ্যে অলটারনেটর, ট্র্যাকশন মটর সম্পূর্ণ ভিন্নতর। এছাড়া চুক্তিপত্র অনুযায়ী ইঞ্জিনগুলো কমিশনের জন্য সব ধরনের মেশিনারিজ, পার্টস ও টুলস হুন্দাই রোটেমের সরবরাহ করার কথা। কিন্তু হুন্দাই রোটেম লোডবক্স টেস্ট প্লান্ট সরবরাহ করেনি এবং ক্যাপিটাল কম্পোনেন্ট ভিন্নতর হওয়ায় পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে সেই টেস্টটি করা হয়নি।
যদিও ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিনের কমিশনিং কাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। এতে কমিশনিং কমিটি ভিন্ন মডেলের অলটারনেটর সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, লোডবক্স সুবিধা পাওয়া যায়নি বলে পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে অধিকসংখ্যক ট্রায়ালের মাধ্যমে তা নিরূপণের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিদ্যমান রেলপথে অনুমোদিত গতির সীমাবদ্ধতা, বিদ্যমান ক্যারেজ এবং ওয়াগনের সর্বোচ্চ গতিবেগে চলাচলের বাধ্যবাধকতার কারণে ট্রায়াল রানের মাধ্যমে ক্যাপিটাল কম্পোনেন্টের সর্বোচ্চ ক্ষমতা তোলা সম্ভব হয়নি।
এদিকে হুন্দাই রোটেম পুরোনো মডেল ও কম ক্ষমতাসম্পন্ন অলটারনেটর সংযোজিত করে ইঞ্জিন সরবরাহ করায় সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে গত ১৩ অক্টোবর রেলওয়ের মাসিক পর্যালোচনা সভায় চুক্তি ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ইঞ্জিন এসেছে কি না, সেটি নিরূপণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কমিটির কার্যকম শুরু হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি বলে বৈঠকে জানানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক নূর আহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক বা রেলপথ সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। পরে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান ও রেলপথ সচিব মো. সেলিম রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

পোষ্টটি প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করতে পারেন...
  • 2
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!