তবু চনপাড়া বস্তিতে ফেরেনি স্বস্তি

তবু চনপাড়া বস্তিতে ফেরেনি স্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

মাদক কারবার থেকে চাঁদাবাজি। সবই ছিল তাঁর কবজায়। ছিলেন চনপাড়া বস্তির অপরাধ জগতের ‘রাজা’। তিনি বজলুর রহমান। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের (চনপাড়া বস্তি) মেম্বার। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রক বজলু কারাগারে গেলেও কাটেনি বস্তিবাসীর মনের ভীতি। চাঁদাবাজি, মাদক কেনাবেচা থেকে শুরু করে সব অপরাধ চলছে ঠিক আগের মতোই।

বজলু কারাবন্দি থাকলেও বদলেছে বস্তির নিয়ন্ত্রক। এখন চনপাড়া বস্তির অপরাধ জগতের ‘চাবি’ বজলুর ঘনিষ্ঠ জয়নালের হাতে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিতে তিনি গড়ে তুলেছেন বাহিনী। তাঁর সঙ্গে আছেন শাহাবুদ্দিন ও সমশের। চনপাড়ায় রয়েছে অন্তত ৪৫ মাদকের স্পট। তাদের ছায়ায় ওই সব স্পটে দিনরাতে চলছে মাদক বেচাকেনা। সোমবার সরেজমিন চনপাড়া বস্তিতে গিয়ে এসব তথ্য মিলেছে।

গত নভেম্বরের শুরুতে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নুর পরশের লাশ উদ্ধারের পর আলোচনায় আসে চনপাড়া। এলাকাটির নিয়ন্ত্রক বজলু মেম্বারের অপরাধ জগতের ফিরিস্তিও আলোচনায় উঠে আসে। এই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অস্ত্র, হত্যা, মাদকসহ বিভিন্ন ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় অন্তত ডজন মামলা রয়েছে। গেল ১০ নভেম্বর গোলাগুলিতে বজলুর এক সময়ের ঘনিষ্ঠ রাশেদুল ইসলাম শাহীন ওরফে সিটি শাহীন মারা যান। শেষের দিকে বজলুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। কারণ বজলুর কাছ থেকে শাহীন সরে এসে নিজেই বাহিনী তৈরি করে বস্তি কবজায় নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। পরে প্রভাবশালী বজলু ১৮ নভেম্বর র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, চনপাড়া বস্তিতে লাখো মানুষের বাস। ৯টি ব্লকে বিভক্ত এই বস্তিতে ডাকাত, অপহরণকারী, চাঁদাবাজ, অজ্ঞান-মলম পার্টির সদস্যরা গেড়েছে নিরাপদ আস্তানা।

সাধারণ বাসিন্দারা বলছেন, গত নভেম্বরে চনপাড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়লে কিছুদিন মাদক কারবারিরা ঘাপটি মেরেছিল, অনেকে ছেড়েছিল এলাকা। কয়েকদিন পরই তাঁরা এলাকায় ফেরেন। পরে স্বাভাবিক হতে থাকে মাদক বেচাকেনা। বস্তির নব কিশলয় হাইস্কুল ও গার্লস কলেজের পশ্চিম পাশের বাড়ির বাসিন্দা মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তাঁর পাশের বাড়িটি আরেক কারবারি জালালের। জালাল এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। বর্তমানে রায়হান ও জালালের বাড়ি খালি পড়ে আছে। এই বাড়িতে মাদকের স্পট গড়ে তুলেছেন ইয়াসমিন নামে এক নারী।

ইয়াসমিন পারিবারিকভাবে মাদক কারবারি। তাঁর মা রহিমনও ইয়াবা কারবারি। চার নম্বর ব্লকের মসজিদের সামনে ইয়াবা বিক্রি করেন মঞ্জুরা ও শাহানাজ নামে দুই নারী। শাহানাজ সম্পর্কে মঞ্জুরার বোনের ছেলের স্ত্রী। আর মঞ্জুরা রহিমনের বোনের মেয়ে। পাঁচ নম্বর ব্লকে ইয়াবা ও ফেনসিডিল বিক্রি করেন মিল্লাত নামে এক কারবারি। তিনি বজলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ। এক নম্বর ব্লকে নাজমা, লিটনসহ অন্তত ১৫ জন মাদক বেচাকেনায় জড়িত। ছয় নম্বর ব্লকে মাজেদ, আট নম্বর ব্লকে মনোয়ারা এবং ৯ নম্বর ব্লকে রুশনি, কালুসহ অন্তত দুই ডজন মাদক বিক্রেতা রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, চনপাড়ায় জমি কিংবা বাড়ি বেচাকেনা হলে চাঁদাবাজির শিকার হতে হয় ক্রেতা-বিক্রেতা দু’জনকেই। মানুষের ঘরবাড়িতে লুটপাটও চলে। সম্প্রতি দুলাল নামে এক বাসিন্দার বাড়ির মালপত্র লুট করে নিয়েছে জয়নাল ও তার লোকজন। দুলালকে এলাকা ছাড়া করা হয়েছে।

রূপগঞ্জ থানার ওসি এএসএম সায়েদ সমকালকে বলেন, চনপাড়ায় প্রায় প্রতিদিন অভিযান চালানো হচ্ছে। কয়েকদিন আগেও ১৪ কেজি গাঁজা, ১০ গ্রাম হেরোইনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাদক কারবারিসহ বিভিন্ন অপরাধীর বিষয়ে কেউ তথ্য দিলে তথ্যদাতার নামপরিচয় গোপন রেখে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়।

Loading

পোষ্টটি প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করতে পারেন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!