পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয় দৃশ্যমান বাস্তবতা

পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয় দৃশ্যমান বাস্তবতা

নিজস্ব প্রতিনিধি :
আজ ১০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা ২ মিনিটে ৪১তম স্প্যান ‘পাপড়ি’ স্থাপনের মধ্য দিয়ে জুড়ে দেওয়া হলো পদ্মার দুই পাড়, যার মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হতে চলেছে বাংলাদেশের সক্ষমতার, স্বপ্ন হলো সত্যি। এর মধ্যদিয়ে শেষ হলো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সেতুর গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ফলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৯টি জেলা।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যানটি খুঁটির উপর বসেছিল ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। এর তিন বছরেরও বেশি সময় পর আজ বৃহস্পতিবার মূল সেতুর ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারে ৪১তম শেষ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে ৬.১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতু। এছাড়াও সেতুর ২ হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্লাবের মধ্যে ১ হাজার ৪১টির বেশি রোড স্ল্যাব বসানো হয়েছে। আর ২ হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্ল্যাবের মধ্যে এখন পর্যন্ত বসানো হয়েছে ১ হাজার ৫০০টির বেশি।

১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য পদ্মা সেতু নির্মাণের এই প্রকল্পের ব্যয় শেষ পর্যন্ত কয়েক দফা বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। সেতুর ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, স্বপ্নটা তো বড়। সব সময় ভালোটার দিকেই চোখ যায়। ভালোটা চোখে পড়লে চোখ সেখানেই আটকে থাকে। একতলা ব্রিজ করলে তো খরচ অনেক কম হতো। বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে নির্মাণ হচ্ছে দ্বিতল সেতু। যার ওপর দিয়ে গাড়ি আর নিচ দিয়ে রেল চলবে। বানানো হচ্ছে কংক্রিট ও স্টিলের সমন্বয়ে। যা বিশ্বে বিরল। ব্যয় তো বাড়বেই।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, এটি একটি সম্ভাবনাময় অবকাঠামো। যা বাংলাদেশের সম্পদ। এই সেতু দেশের জিডিপিতে অবদান রাখবে ১ দশমিক ২ শতাংশ। দেশের ১৬ কোটি মানুষকে এক সুতোয় গাঁথবে। সব অসম্ভবকে সম্ভব করে আজ সেতুর পুরো ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান। এটিই বাস্তবতা। এই সেতু নির্মাণে নানা ধরনের কুসংস্কারও এসেছিল অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করতে। সব কাটিয়ে পদ্মার দুই পারের মানুষ আজ উৎসব করছে।

পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প হতে জানা যায়, পদ্মা একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের সঙ্গে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর যুক্ত হয়েছে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অংশের সরাসরি সংযোগ ঘটবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু ছিল চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ব্রিজটির ওপরের স্তরে রয়েছে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচে একটি একক রেলপথ। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকায় ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যর ৪১টি স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে ৬ দশমিক ১৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৮ দশমিক ১০ মিটার প্রস্থ পরিকল্পনায় নির্মিত হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় এই সেতু। এটির জন্য প্রয়োজনীয় এবং অধিগ্রহণকৃত মোট জমির পরিমাণ ৯১৮ হেক্টর।

প্রকল্প প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত কিছু লোকের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় বিশ্বব্যাংক তার প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেয়। অন্যান্য দাতারাও সেটি অনুসরণ করে। পরে দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এই ঘটনায় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ও সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইয়াকে জেলেও যেতে হয়েছিল। পরে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কানাডিয়ান আদালত মামলাটি বাতিল করে দেয়।

বর্তমানে প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে অর্থায়ন করা হচ্ছে। এইকম-এর ডিজাইনে বহুমুখী আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প ‘পদ্মা বহুমুখী সেতুর’ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১১ সালে এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালে। মূল প্রকল্পের পরিকল্পনা করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৭ সালের ২৮ আগস্ট ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা বাজেটে পদ্মা সেতু প্রকল্প পাস করেছিল ওই সরকার। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে সেতুতে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় ব্যয় সংশোধন করে ধরা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। পরে আরও আট হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়। ২০১৮ সালে ব্যয় বাড়ে আরও ১৪শ কোটি টাকা। এতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকায়।

পোষ্টটি প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করতে পারেন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!