ফিলিস্তিন, আল-আকসা, মুসলমানদের অনুভুতি বনাম ইসরাইল

ফিলিস্তিন, আল-আকসা, মুসলমানদের অনুভুতি বনাম ইসরাইল

নিউজ ডেস্কঃ
গত কিছু দিন থেকে দখলদার ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনে সর্বাত্নক যে হামলা হচ্ছে তা এক নজরে একটু দেখে নিইঃ

দখলদার ইসরাইল অধিকৃত ফিলিস্তিনের পূর্ব বায়তুল মুকাদ্দাস শহরের শেখ জাররাহ শরণার্থী শিবিরের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের উচ্ছেদ এবং তাদের ঘর-বাড়ি ধ্বংস ও ফিলিস্তিনিদের সেখান থেকে জোর করে বের কের দেয়ার চেষ্টা করছে। সেখানে নতুন একটি অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন করার কাজ করছে ইসরাইল। এই নিয়ে গত কয়েকদিনে ইসরাইলি সেনা ও  বসতি স্থাপনকারী ইহুদিদের সাথে ফিলিস্তিনিদের দফায় দফায় সংঘর্ষ চলছিল।

এরই মধ্যে গত ০৭ মে, শুক্রবার রাতে আল-আকসা মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় মুসল্লিদের ওপর বর্বর হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এ সময় তারা মুসল্লিদের ওপর রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস এবং স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে।

পরদিন ০৮ মে পবিত্র শবে কদরের রাতেও ফিলিস্তিনিদের ওপর তাণ্ডব চালানো হয়। এতে প্রায় ৪০০ ফিলিস্তিনি আহত হয়।

১০ মে, সোমবার ভোরে আবারও ইসরাইলি বাহিনী আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ঢুকে ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের ওপর রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও বোমা ছুড়েছে। এতে প্রায় ১২০ ফিলিস্তিনি আহত হয়।

১০ মে, সোমবার আল-আকসা মসজিদ এবং পূর্ব বায়তুল মুকাদ্দাস শহরের শেখ জাররাহ শরণার্থী শিবির থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনি আটককৃতদের ১ ঘন্টার মধ্যে মুক্তি দিতে তেল আবিবকে সময়সীমা বেধে দয় ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় ওই সময়সীমা পার হওয়ার কয়েক মিনিট পর অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা থেকে ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে রকেট নিক্ষেপ করে হামাস।

ইসরাইলের উদ্দেশ্যে হামাসের রকেট হামলা

এই রকেট হামলার পর ইসরাইলি বাহিনী গাজা উপত্যকার বেসামরিক এলাকায় বর্বরোচিত কায়দায় বিমান হামলা করে

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বিমান হামলা
বর্বর ইসরাইলের বিমান হামলা

১১ মে, মঙ্গলবার রাতে বিমান হামলার জবাবে ইসরাইলের তেল আবিব, আশকেলন বি’র শেবা ও সেদরত, আশদোদ এবং আসশকেলন শহরের  লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ব্যাপকভাবে রকেট নিক্ষেপ করে হামাস। গাজায় হাসপাতালসহ বেসামরিক স্থাপনায় ইসরাইলের নৃশংস বিমান হামলার জবাবে তেল আবিবে নজিরবিহীন রকেট হামলা চালিয়েছে গাজা-ভিত্তিক ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামী হামাস। এসব রকেট তেল আবিবের আকাশ দিয়ে উড়ে গিয়ে দূরবর্তী হাইফা ও নাজারেথ শহরেও আঘাত হানে। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা থেকে ইসরাইল অভিমুখে অন্তত ১০০০ এর অধিক রকেট নিক্ষেপ করে হামাস।

তেল আবিবের একটি বাসে হামাসের রকেট হামলা

বুধবার রাতে অধিকৃত ফিলিস্তিনে পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর ঈদ ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও ইসরাইলি বিমান হামলা বন্ধ হয়নি।
১৩ মে, বৃহস্পতিবার আল-আকসা মসজিদে বিশাল ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ইসরাইলের বর্বরোচিত দমন অভিযান অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও এ জামাতে  লাখের বেশি ফিলিস্তিনি মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন।

মসজিদুল আল-আকসায় বিশাল ঈদের জামাত

মুসলমানদের নিকট মসজিদুল আল-আকসা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
♥ আল আকসা! এটা মুসলমানদের প্রথম কিবলা (The First Qibla Of Muslims)
♥ এই মসজিদের নির্মাণের সাথে জড়িয়ে আছে হযরত আদম (আঃ) এবং সুলাইমান (আঃ) এর নাম।
♥ এটা কোন সাধারণ ভূমি নয়,  এটা হচ্ছে সেই পবিত্র পুন্য ভূমি ফিলিস্তিন যার কথা মহান আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র ﷻ কুরআনে বলেছেন, যে আল-আকসার পবিত্রতা মহান আল্লাহ্ তায়ালা ﷻ নিজে বর্ণনা করেছেন।
♥ এটা সেই ভূমি যেখানে পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল।
♥ এটা সেই আল-আকসা যেখানে এক রাকাত সলাত ৫০০ রাকাত সলাতের সমান।
♥ এটা সেই আল-আকসা যেখান থেকে আল্লাহর প্রিয় নবী ও রাসুল হযরত ﷺ মুহাম্মাদ (সাঃ) মিরাজে আল্লাহর ﷻ সাথে সাক্ষাতের জন্য উর্ধ্বআকাশ গমন করেছিলেন।
♥ এটা সেই আল-আকসা যেখানে আল্লাহর বন্ধু প্রিয় নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর ঈমামতিতে সকল নবী রাসুল এবং ফেরেস্তাদেরকে নিয়ে জামাতে নামাজ পড়ছিলেন।
♥ এটা সেই ভূমি যেখানে ইসা(আঃ) ইবনে মারইয়াম عليه السلام সবচেয়ে বড় ফিতনা দাজ্জালকে হত্যা করবেন।
♥ এটা সেই ভূমি যার কথা রাসূল ﷺ বলেছেন, যার আশেপাশে দুনিয়ার সেরা মানুষেরা বসবাস করবে, যেখানে আল্লাহর নবী ইব্রাহিম(আঃ) عليه السلام হিজরত করেছিলেন।
♥ এটা সেই আল-আকসা যা সুলাইমান (আঃ) জ্বীনদের দ্বারা পুনঃনির্মান বা সংস্কার করেছিলেন।
♥ এর সাথে জড়িয়ে আছে খলিফা হজরত উমর (রা) এর বিখ্যাত উটের ঘটনা।
♥ এর সাথে জড়িয়ে আছে দ্যা গ্রেট সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবীর অসংখ্য স্মৃতি।
♥ এই মসজিদের পাথরের গায়ে লেখা রয়েছে সম্পূর্ণ সূরা ইয়াসিন।
♥ এই ভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা আল্লাহ্ ﷻ এবং তাঁর রাসূলের ﷺ সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার সামিল।

আল-আকসায় পবিত্র লাইলাতুল কদর নামাজরত মুসল্লিরা

এরপরেও শত্রুরা কিভাবে চিন্তা করে মুসলিমরা এই ভূমি ত্যাগ করবে। আল-আকসা প্রতিটি মুসলিমের হৃদয় ধারণ করে। ইনশাআল্লাহ অচিরেই আমরা মুসলমানরা অভিশপ্ত ইহুদিদের কাছ থেকে আল-আকসা উদ্ধার করবই ইনশাআল্লাহ।
আর মনে রাখবেন,যখন আমাদের ফিলিস্তিনের ভাই বলে তারা যেকোন বিনিময়ে আল-আকসা রক্ষা করবে তখন আমরা মুসলিমরা ও তাদের সাথে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলে আল-আকসা উদ্ধারের লড়াইয়ে অচিরেই শামিল হবো ইনশাআল্লাহ।

তোমাদের কেউ যদি কোনো খারাপ কাজ বা বিষয় দেখে তাহলে সে যেন হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয়, যদি তা করতে অপারগ হয় তাহলে যেন মুখ দিয়ে তার প্রতিবাদ করে, যদি তাও করতে সক্ষম না হয় তাহলে যেন অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে, আর এটাই হচ্ছে ঈমানের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বলতম স্তর। (বুখারি, হাদিস নং: ১৯৪)

আমরা রাতে ঘুমানোর সময় বোরকা পরিধান করে ঘুমাতাম, রাতে বোমা হামলায় মৃত্যু হলে সকাল বেলা যেন কেউ আমাকে বেপর্দায় না দেখে। (এক ফিলিস্তিনী বোন)

আজ ১৫ বছর ধরে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ গাজা নামক একটা মুক্ত কারাগারে বাস করে আসছে। যেখানেঃ
♦ বেকারত্বের হার ৪৯%
♦ দারিদ্র্যের হার ৫৬%
♦ প্রয়োজনীয় ওষুধের হার ৫০%
♦ সরবরাহ কৃত পানির ৯৭% দূষিত । গাজার পানির কূপগুলো অতি ব্যবহারে এখন খুব বিষাক্ত।
♦ গাজার আকাশ আর সীমান্ত নিয়ন্ত্রন করে ইসরাইল। ইসরাইলের অনুমতি ছাড়া কোন মানুষ আর পন্য গাজায় প্রবেশ আর গাজা থেকে বের হওয়া যায় না।
♦ গাজাবাসীর অর্ধেকের বেশি শিশু-কিশোর। যাদের ৪০% এর বয়স ১৪ এর নীচে।
♦ গাজায় ২০ ঘন্টা বিদ্যুত থাকে না। যা কন্ট্রোল করে ইসরায়েল।

ইসরাইলকে যারা শাসন করে তারা মূলত ইউরোপীয় ইহুদী। এদেরকে বলা হয় আশকেনাজি জুইশ। এরা ইউরোপ থেকে এসে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে গেড়ে বসা ইহুদী। কিছু আরব ইহুদী আছে, যারা আগে থেকেই ফিলিস্তিনে ছিল। আর কিছু অন্যান্য আরব দেশ থেকে এসেছে। এদেরকে বলা হয় মিজরাহি জুউশ। আর আছে কিছু হিস্পানিক জুইশ
এদের মধ্যে বর্তমানে এলিট শ্রেণী হচ্ছে- আশকেনাজি জুইশ। এরাই মূলত জার্মান আর ফ্রান্স থেকে বিতাড়িত হয়ে ফিলিস্তিনীদের জমি দখল করেছে। এরা অসম্ভব উগ্র, জেনোফোবিক এবং ধণী। ইসরাইলের এলিট শ্রেণী হচ্ছে এরা। এদের কালচারের সাথে আরব ইহুদীদের কালচার কোনোভাবেই মিলেনা।

ইহুদী ধর্ম অনুযায়ী মেসিয়াহ (মুসলমানদের কাছে দাজ্জাল) না আসা পর্যন্ত ইহুদীদের জন্য আলাদা দেশ গঠন করা পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ। এই কারণেই অন্যান্য দেশের অর্থোডক্স ইহুদী এবং ইহুদী ধর্মগুরুগণ ইসরাইলের বিরোধী। কারণ এই রাষ্ট্র ইহুদী ধর্মমতেও নিষিদ্ধ।

ধর্মীয় দেশ দাবী করলেও ইসরাইল মূলত কোনো ইহুদী দেশ নয়, এটা একটা জায়োনিস্ট দেশ। সহজ ভাষায় বললে- জায়োনিজম হচ্ছে ইহুদী জাতীয়তাবাদের একটি পলিটিক্যাল টার্ম। জায়োনিস্ট হওয়ার জন্য ইহুদী হওয়া শর্ত নয়। অর্থাৎ ইহুদী নন এমন ব্যক্তিরাও জায়োনিস্ট হতে পারেন। আবার ইহুদী মানেও জায়োনিস্ট নয়। জায়োনিজমকে বাংলায় ইহুদীবাদ বলা হয়। হিন্দু আর হিন্দুত্ববাদ যেমন এক নয়, অনেকটা সেরকম। ইহুদী ধর্মকে বলা হয় জুদাইজম।


জায়নবাদের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে স্টেট অব ইসরাইল জাতির পিতা থিওডোর হের্জল হিব্রু ভাষায়: תִאוַדָר הֶרְצֵל‎, টিভাডের হার্টজেল। যার স্বপ্ন ছিল তার মুভমেন্টের সমর্থক ইহুদীদের জন্য আলাদা একটা দেশ হবে এবং সেটা হবে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে।
সে আবার অবশ্য তার জীবদ্দশায় ইসরাইল দেখে যেতে পারেনাই। তবে সে নানাভাবে চেষ্টা করেছিল।

ওসমানী খলীফা আব্দুল হামীদকে সে চিঠি লিখে প্রস্তাব দিয়েছিল যেন ইহুদীদের জন্য বাইতুল মোকাদ্দাসের কাছে কিছু জমি বরাদ্ধ দেয়া হয়। বিনিময়ে তুরস্কের সব ঋণ পরিশোধ করে দেয়া হবে। খলীফা এই প্রস্তাব নাকচ করে দিলে ১৯০১ সালের মে মাসে থিওডোর হের্জল তার ক্লোজ ফ্রেন্ড পোলিশ ফিলিপ নিউলিন্সকিকে দিয়ে আবার প্রস্তাব পাঠায়। এবারে খলীফার জন্য বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ সহ নানা উপহারের প্রস্তাব দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, অন্যান্য ব্যবসা এবং সুদের ব্যবসা করে ইহুদীরা অনেক আগে থেকেই প্রচুর সম্পদের মালিক। ব্যাংকিং কনসেপ্ট জিনিসটাই ইহুদীদের থেকে তাদের সুদের ব্যবসা থেকে এসেছে। এই কারণে তাদের সম্পত্তি ছিল অঢেল। খলীফা আব্দুল হামীদ বলেছিলেন- ফিলিস্তিনের ভূমি আমার একার সম্পদ নয় যে আমি লিখে দেব। প্রতিটা মুসলমানের রক্তের ফোঁটাতে এর মালিকানা। আমি বেঁচে থাকতে সেটা হতে দিতে পারিনা।
খলীফা আব্দুল হামীদ মারা গেছেন, ওসমানী খেলাফত ধ্বংস হয়েছে। খেলাফত বিলুপ্ত হয়েছে। বৃটিশরা যুদ্ধে জিতেছে। থিওডোর হের্জল মারা গেছে। ইহুদীদের কুটবুদ্ধির জোরে তার আইডিওলজি দিনে দিনে শক্তিশালী হয়েছে। তার স্বপ্নের দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বৃটিশরা ইউরোপ থেকে মার খাওয়া ইহুদীদের জন্য জায়গা বরাদ্ধ করে দিল ফিলিস্তিনে। থিউডরের স্বপ্নের সেই দেশ প্রতিষ্ঠিত হলো ফিলিস্তিনীদের রক্তের উপর। লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হলো। ঘরবাড়ী এবং জীবন হারালো। জায়োনিস্টদের তখন সশস্ত্র মিলিশিয়া ছিল। তারা ফিলিস্তিনীদের হত্যা করতো, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে সেই ভূমি দখল করতো। এবং তারা এই কাজে  বিশেষভাবে বৃটিশদের সহায়তা পেত।

ইহুদীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই ইসরাইলেও ইহুদীরাই বৈষম্যের শিকার হয়।  এ নিয়ে তারা অনেকবার রাস্তায় নেমেছে। সবচেয়ে বেশী শিকার হয় আরব ইহুদীরা। কারণ তাদের ভাষা আরবী, তাদের বেশভূষা আরব মুসলমানদের মত। আরবী বলার কারণে তাদের চাকরী হয়না, আরবদের মত পোষাক পরায় চাকরী হয় না। ধর্মে ইহুদী হওয়ার পরও জাতিতে একই না হওয়ায় তারা নানা বৈষম্য এবং হেনস্থার শিকার হয়। তাদের বলা হয় আরবদের ঘৃণা করতে। তো যারা পূর্বে আরব দেশে ছিল, তারা অর্থ্যাৎ বৃদ্ধরা বিষয়টা মেনে নিতে পারেনা। তারা প্রতিবাদ করে। কোনো লাভ হয় না।  যারা নিজ ধর্ম ইহুদীদের সাথেই এমন করে, তারা আরব মুসলমানদের সাথে কেমন আচরণ করবে সেটা সহজেই অনুমেয়।


ইসরাইল শুরু থেকেই বৃটিশ এবং আমেরিকানদের প্রত্যক্ষ সাপোর্ট পেয়ে আসছে। আরব ইসরাইল যুদ্ধে আমেরিকান সৈন্যরা ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধ করেছে বলেও বলা হয়। এখনো যখন ইসরাইল ফিলিস্তিনীদেরকে হত্যা করে, নারী-শিশুদেরও হত্যা করে, ধরে নিয়ে যায় এ নিয়ে জাতিসংঘ ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব আনলে আমেরিকা ভেটো দেয়। সরাসরি ইসরাইলকে রক্ষা করে। জাতিসংঘের আইন, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, যুদ্ধাপরাধ আইন সব কিছুই তারা নিয়মিত লংঘন করে। কিন্তু তাতে তাদের কোনো কিছুই হয় না। কারণ আমেরিকা আছে। তারা প্রকাশ্যেই ইসরাইলকে রক্ষা করে নেয়, একদম নগ্নভাবে।

ইসরাইলের কোনো সীমানা নেই। কারণ, তারা প্রতিদিনই দখল করে চলেছে। যেকোনো দিন ইহুদী সেটেলার এসে আপনাকে বলবে এই ঘর আমার। এরপর ইজরায়েলী পুলিশ এসে আপনাকে বের করে দেবে, পুরুষদের জেলে নিয়ে যাবে। তারপর বুলডোজার এসে আপনার ঘর গুঁড়িয়ে দেবে। এরপর সরকারী টাকায় সেখানে ইহুদীদের জন্য ঘর বানানো হবে।
নিজেদের শত শত বছরের ভিটেবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়া ফিলিস্তিনীরা এক দিনেই উদ্বাস্তু হয়ে গেল। রিফিউজি হিসেবে কোথাও আশ্রয় নিতে হবে। এভাবে তারা প্রতিদিন ঘরবাড়ী দখল করে নেয় আর ফিলিস্তিনীরা উদ্বাস্তু হয়।

বিমান হামলায় শহীদ ফিলিস্তিনিদের জানাযার নামাজ

ইহুদীদের জন্য ঘরবাড়ী বানানোর জন্য যে টাকা খরচ হয়, তার জন্যও আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে সরকারী এবং বেসরকারিভাবে টাকা আসে। আমেরিকা থেকে প্রতিবছর ইজরায়েলের জন্য প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা আসে।
পশ্চিমের দেশগুলোতে ইজরায়েলীদের জন্য প্রায় ভিসা ফ্রী। নামী দামী ইউনিভার্সিটি গুলোতে তারা স্কলারশিপ পায়। এর বাইরে আবার প্রায় সব বড় বড় কোম্পানীর বিলিয়ন ডলারের ইনভেস্টমেন্ট আছে ইজরায়েলে। তারা শিক্ষাখাতে ইনভেস্ট করে, গবেষণা খাতে ইনভেস্ট করে, ট্যুরিজম খাতে ইনভেস্ট করে।


অন্যদিকে ফিলিস্তিনীরা আগামীকাল পর্যন্ত তাদের বাড়ীটা থাকবে কিনা জানে না। প্রাণ থাকবে কিনা সেটাও জানেনা। স্কুলটা থাকবে কিনা তাও জানেনা। রাত বিরাতে এসে তল্লাশী চালিয়ে ইজরায়েলী পুলিশ যাকে তাকে ধরে নিয়ে যায়। অল্পবয়সী শিশু হলেও কোনো রক্ষা নাই। ফিলিস্তিনীদের সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশ ফোর্স রাখারও পারমিশন নাই। ফিলিস্তিনী সিকিউরিটি ফোর্স নামে একটা বাহিনী আছে, তাদের ভারী কোনো অস্ত্র রাখার অনুমতি নাই। ইসরাইলের সাথে এক চুক্তিতে এটা মেনে নেয় ইয়াসির আরফাতের পিএলও। ফলে মাহমুদ আব্বাস নামের প্রেসিডেন্ট হলেও কাজে কোনো ক্ষমতা তার নাই।

ইসরাইল দখল করতে করতে ফিলিস্তিনকে এমনভাবে দখল করেছে- একপাশে গাজা উপত্যকা, অন্যপাশে পশ্চিম তীর। মাঝখানে ইসরাইল।

ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি

ব্যাপারটা অনেকটা পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মত পশ্চিম তীর আর গাজা, মাঝখানে ভারতের মত ইসরাইল। ইসরাইলিরা পৃথিবীর ১৬০টি দেশে প্রায় ভিসা ফ্রী ঘুরতে পারলেও ফিলিস্তিনীরা এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় যেতে ইজরায়েলের অনুমতি নিতে হয়। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা থেকে যদি কেউ ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে যেত চায়, তাহলে অনেকদিন আগে এপ্লাই করতে হয়। তাও ৯০% ক্ষেত্রে অনুমতি পাওয়া যায় না। জিজ্ঞাসাবাদে ইসরাইল সন্তুষ্ট হলেই কেবল অনুমতি দেয়। বেশীরভাগ গাজাবাসী কখনো আল-আকসা মসজিদ চোখে দেখেনি। কারণ আল-আকসার অবস্থান পশ্চিমতীরে।

পিএলও আর হামাস হচ্ছে ফিলিস্তিনের দুটি রাজনৈতিক দল। হামাস সংখ্যাগরিষ্ঠ গাজাতে আর পিএলও পশ্চিম তীরে।
তবে ২০০৬ সালে পুরো ফিলিস্তিনের নির্বাচনে হামাস জয়লাভ করে ফিলিস্তিনের ক্ষমতায় আসে। ইসমাইল হানিয়া প্রধানমন্ত্রী হয়। কিন্তু মাহমুদ আব্বাস প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা দখল করে নেয়। (অনেকটা পাকিস্তানের নির্বাচনের মত। শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচিত হয়েও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। ইসমাইল হানিয়ার ক্ষেত্রেও তাই ঘটে।)  ইসমাইল হানিয়া তার এলাকা গাজাতেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকেন।

ইসমাইল হানিয়া (বামে) ও মাহমুদ আব্বাস

মাহমুদ আব্বাসের পিএলও ইসরাইলী সকল শর্ত মেনে ফিলিস্তিন তথা পশ্চিম তীরকে ডিমিলিটাইরাইজড করলেও ইসমাইল হানিয়ার নেতৃত্বাধীন গাজার হামাস সেটা মেনে নেয়নি। পশ্চিম তীরে ইসরাইলী শর্ত অনুযায়ী কোনো সেনাবাহিনী নেই। সিকিউরিটি ফোর্স আছে, যাদের নামে মাত্র একটা পুলিশ ফোর্স আছে। যেটা আছে তাদেরও শর্ত হচ্ছে ইসরাইলী পুলিশকে সাহায্য করতে হবে। তাদের কোনো ভারী অস্ত্র নেই। হাল্কা অস্ত্র যা আছে, সেটাও ইসরাইলের দেয়া। ওদের গাড়ীও ইসরাইলের দেয়া। যা ইসরাইল সবসময় ট্রাকিং করে। কোনো ফিলিস্তিনীকে জোর করে বেআইনিভাবে ধরে নিয়ে গেলেও ফিলিস্তিনী সিকিউরিটি ফোর্স কিছু করতে পারেনা। এজন্য পশ্চিম তীরের যেকোনো বাড়ীতে ইজরায়েলী পুলিশ চাইলে যেকোনো সময় তল্লাশী চালাতে পারে। আমরা যে পাথর ছুড়ার দৃশ্য দেখি, এগুলা বেশীরভাগই পশ্চিম তীরের। কারণ তাদের অস্ত্র রাখার অনুমতি নেই। ইচ্ছে হলেই যে ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়ে দখল করে নেয়, সেটাও পশ্চিমতীরে। কারণ পশ্চিমতীর ইসরাইলী  অকিউপ্যাশনে। এখানকার বাসিন্দারা মোটামুটি চলাচলের স্বাধীনতা পেলেও ঘরবাড়ী কখন বেদখল হয়ে যাবে বলতে পারে না। এতে ফাতাহ বা পিএলও কিছু করতে পারেনা।



অন্যদিকে হামাস শাসিত গাজা উপত্যকা ইসরাইলের কোনো শর্ত মানে না। তাদের মিলিটারী আছে। তাদের অঞ্চলে ইসরাইলী  পুলিশ ঢুকতে পারেনা। তারা নিজেরাই সেখানকার নিরাপত্তা দেয়। তাদের আর্টিলারি ইউনিট আছে। তাদের কাছে ভারী অস্ত্র আছে। যার বেশীরভাগ তারা নিজেরাই তৈরী করে। এখানে ইসরাইলী সেটেলাররা তো দূরের কথা, ইসরাইলী পুলিশ, ইসরাইলী  আর্মিও ঢুকতে পারেনা। ইসরাইলী  শর্ত মেনে না নেয়ায় গাজা উপত্যকাকে ইসরাইল চারিদিক থেকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। গাজার দুইদিকে ইসরাইল, একদিকে মিশর, আরেকদিকে সমুদ্র। তাদের উপর ইসরাইল ল্যান্ড, এয়ার এন্ড সী ব্লক দিয়ে রেখেছে। গাযা উপত্যকাকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জেলখানা।

মিশর সীমান্তে আব্দেল ফাত্তাহ আল সিসি দেয়াল তুলে দিয়েছে। ফিলিস্তিনীদের চলাচলের জন্য মাটির নীচে সুড়ঙ্গ ছিল, সেগুলো সে বন্ধ করে দিয়েছে। মুহাম্মদ মুরসী ক্ষমতায় আসার পর যখন মিশর সীমান্ত ফিলিস্তিনীদের জন্য খুলে দেয়, তখন ইসরাইল  মুরসীকে সবচেয়ে বড় থ্রেট হিসেবে নেয়। ইসরাইল, সৌদি ও আমিরাত জোট মুরসীকে হটিয়ে সিসিকে ক্ষমতায় আনে। সে সময়ে সিসিকে সবার আগে অভিনন্দন জানায় সৌদি আরব। যদিও ইসরাইলের উদ্দেশ্য আর তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন, কিন্তু লক্ষ্য ছিল একই। ফলে কপাল পুড়ে ফিলিস্তিনীদের। এরপর থেকেই ফিলিস্তীনের জন্য সেই মিশর সীমান্ত বন্ধ হয়ে যায়। সুড়ঙ্গ পথ ব্যবহারের জন্য মিশর সীমান্তে যে ঘরবাড়ি গুলো ছিল, বুলডোজার দিয়ে সেসব বাড়ীও ভেঙে দেয় মিশর।

ইসরাইলের বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া মসজিদের আগের ও পরের ছবি

হামাস শাসিত গাজায় শিক্ষার হার ৯৯%। ইসরাইলী হামলায় ঘরবাড়ি ভেঙে গেলে সবার আগে তারা স্কুল গুলোকে ঠিক করে। তাদের একটা আন্তর্জাতিক মানের ইউনিভার্সিটি আছে। গাজায় একটা বিমানবন্দর ছিল, গাজা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট নামে, যা ইসরাইল ধ্বংস করে দেয়। পুরো ফিলিস্তিনে আর কোনো এয়ারপোর্ট নেই।

ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের সাথে ইসরাইলের ফুল স্কেলে দুইবার যুদ্ধ হয়। এতে ইসরাইলী আর্মীর ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। ২০১৪ সালের যুদ্ধে ইসরাইলী সেনাদের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলে ইসরাইল পিছু হটে। জুলাইয়ের ৮ তারিখ থেকে আগস্টের ২৬ তারিখ পর্যন্ত স্থায়ী এই যুদ্ধে প্রায় ১শ ইসরাইলী সেনা নিহত হয়, অপরদিকে দুই হাজার ফিলিস্তিনী শহীদ হয়। কিন্তু ইসরাইলের  জন্য এটাও ছিল বিশাল ধাক্কা। গাজা উপত্যকায় খাবার, নিত্য প্রয়োজনীয় ওষুধ চোরাই পথে আনতে হয়। ইরান চোরাইপথে অস্ত্র আর কাতার টাকা দেয়। এর বাইরে তুরস্ক সমুদ্র সীমা আর ইজরায়েলী সীমানা ব্যবহার করে জাহাজ ভর্তি খাবার, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য গাযায় পৌঁছে দেয়। একবার তুরস্কের একটা জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল ইসরাইল। সৌদি আরব সহ অন্যান্য আরব দেশগুলো তাদের দানের একটা বড় অংশ ফিলিস্তিনে পাঠায়। তবে সেটা গাজায় যায় না বরং পশ্চিমতীরে যায়।

গাজা, ফিলিস্তিন

ইসরাইল হামাসকে বার বার বলছে- তোমরা যদি আমাদের শর্ত মেনে নাও, সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করো, অস্ত্র সমর্পণ করো, নিরস্ত্র হও তাহলে তোমাদের অবরোধ আমরা তুলে নেব। তোমরা যেখানে চাও যেতে পারবে। আমাদের এখানে চাকরী করতে পারবে। যা কিনতে চাও, তা কিনতে পারবে।

মাহমুদ আব্বাসের পিএলও পশ্চিমতীরে এই শর্ত মেনে নিলেও ইসমাইল হানিয়া আর খালিদ মিশালের গাজা উপত্যকার হামাস সেটা মেনে নেয়নি। যার কারণে তারা অবরুদ্ধ। এই কারণে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনীরা ইজরায়েলের দিকে ঢিল আর পাথর ছুঁড়লেও গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনীরা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করে, ইজরায়েলের দিকে মিসাইল ছুঁড়ে থাকে।

ফাদি আবু সালাহ এর মুক্তি সংগ্রাম

যদিও ইসরাইলী অত্যাধুনিক ডিফেন্স সিস্টেম আইরন ডোম ফিলিস্তিনীদের এই মিসাইল আকাশে থাকতেই ধ্বংস করে। তবে এইবার ইসরাইলের আইরন ডোম হামাসের মিসাইলগুলো সব আটকে দিতে সক্ষম হয়নি। অনেক গুলো মিসাইল ইজরায়েলের নানা শহরের রাস্তা এবং ভবনে আঘাত হেনেছে। এতে ইসরাইলসহ তার মিত্ররা খুব অবাক হয়েছে।


আইরন ডোম কতটা আঘাত ঠেকাতে সক্ষম সেটা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। কারণ হামাসের মিসাইল গুলো কোনো অত্যাধুনিক মিসাইল নয়। এগুলো তারা পাইপ এবং অন্যান্য পরিত্যক্ত জিনিসপত্র থেকে বানায়। এই হ্যান্ডমেইড রকেট গুলো আঘাত হানার পর আইরন ডোম কতটা সেফ সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক সামরিক সহায়তা, বিলিয়ন ডলারের শিক্ষা এবং রিসার্চের ইনভেস্টমেন্ট, প্রায় ভিসা ফ্রী ট্রাভেল, নামী ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ, আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের একনিষ্ঠ সাপোর্ট এত কিছু পাওয়া ইসরাইলের  সাথে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনের তুলনা করার সময় আপনাদের লজ্জা করে না?

চলমান যুদ্ধ থেকে হামাসের অর্জনগুলো কি কি?
ইসরাইলী আক্রমণে প্রায় ২০০ জন ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছে। অ্যাডভান্স টেকনোলজির বিরুদ্ধে হামাস এখন পর্যন্ত রেসিস্ট করে আসছে। অনেকেই অতিমাত্রায় লিবারেল সাজতে গিয়ে বলেন- হামাস কেনো রকেট মারে। তাইলে তো ইজরায়েল কিছু বলতো না। আপনাদের জেনে রাখা দরকার- হামাস রকেট না মারলেও হাজার হাজার ফিলিস্তিনদের বাড়ি থেকে যখন তখন গ্রেফতার করে নিয়ে যায় জায়োনিস্টদের সেনারা। বাড়িঘর দখল করে নেয়। বাচ্চাদেরকে আঘাত করে। উপরের আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গেছেন। এবারের যুদ্ধে হামাসের বেশ কিছু অ্যাচিভমেন্ট রয়েছে। খোলা চোখে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু আমাদেরকে নাড়া দিয়ে গেলেও এর পজিটিভ দিক গুলো ভাবা উচিত।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার সাতান্ন হাজারের মত সেনা নিহত হয়। যেখানে ভিয়েতনামিজ মারা যায় এক মিলিয়নেরও উপরে। কিন্তু যুদ্ধে কিন্তু ভিয়েতনামই জয়ী। আফগান রাশিয়া যুদ্ধে রাশিয়ানদের চেয়ে তালেবানের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হলেও যুদ্ধে তালেবানরাই জিতেছে। একই কথা খাটে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারেও। আমাদের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হলেও আমরা জিতেছি।
যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও যুদ্ধে কে জিতেছে সেটা বুঝতে দেখতে হবে কার উদ্দেশ্য হাসিল হয়েছে। আফগানে এখন তালেবানদের পঞ্চাশ শতাংশের মত নিয়ন্ত্রণ আছে। আমেরিকা চলে যাওয়া মাত্রই বাকিটাও দখল করে নিবে। ফলে আমেরিকা যতই বলুক যে তারা জিতেছে, আসলে তালেবানরাই জিতেছে। কারন তাদেরকে ধ্বংস করতে পারে নাই!

হামাসের অর্জন-
১. আয়রন ডোমকে একটু বাজিয়ে দেখা হলো। যদি একসাথে অনেক বেশি রকেট বা মিসাইল ছোড়া হয় তবে সেটা আয়রন ডোম প্রোপারলি ডিটেক্ট করতে পারে না। হামাসের তিন হাজারের উপরের রকেট থেকে ডিটেক্ট করতে পেরেছে ৬০% এর মত। আয়রন ডোমের এ দুর্বলতা জানা গেলো।

২. এতোদিন একচেটিয়া পশ্চিমা ন্যারেটিভ মানুষ গোগ্রাসে গিলতো। সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, রয়টার্স ইত্যাদি। আল জাজিরা, টিআরটি, আনাদলু এজেন্সি সবাইকে একদম ন্যাংটা করে দিছে। ফলে প্রথম দিকে ইজরায়েলের নাম না নিলেও এখন মোটামুটি সব পশ্চিমা মিডিয়াই ইসরাইলের নাম নিচ্ছে। মিডিয়া যুদ্ধে হেরে যাওয়ার ফলেই মূলত বিমান হামলা করে আল জাজিরার বিল্ডিং গুড়িয়ে দেয় ইসরাইল। এপি না থাকলে হয়তো আল জাজিরার টিমকে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করতো না।

পশ্চিমা মিডিয়া যা দেখে

৩. ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, কিন্তু এ যুদ্ধে মাহমুদ আব্বাসের খুব একটা গুরুত্ব নেই। জো বাইডেন মাহমুদ আব্বাসকে কল দিলেও উনিও জানেন যে এ যুদ্ধ পুতুল আব্বাস থামাতে পারবে না। হামাসের গুরুত্ব ফিলিস্তিন তো বটে, মুসলিম অমুসলিম সব রাষ্ট্রের কাছেই বৃদ্ধি পাবে।

৪. এবারের যুদ্ধে অভূতপূর্ব সাপোর্ট পেয়েছে ফিলিস্তিন। আইরিশ এমপি, অস্ট্রিয়ান এমপি, মার্ক রাফালো, ইমরান খান, খোমেনি, এরদোয়ান, শেখ হাসিনা সহ বেশিরভাগ বিশ্ব নেতারাই ফিলিস্তিন এর পক্ষে ছিলেন। লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্র, প্যারিস, তুরস্ক, কাতারসহ মোটামুটি সব দেশেই ক্ষুদ্র বা বৃহৎ র‍্যালি ও বিক্ষোভ হয়েছে। ফিলিস্তিনি ও হামাসের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধ  যোদ্ধাদের আরও মোটিভেট করতেও ভূমিকা রাখবে।


৫. পশ্চিমারা হামাসকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে দাড় করানোর যে প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে সেটা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সারা বিশ্ব দেখেছে যে ইসরাইল সন্ত্রাসী।

৬. সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে হামাস সহ প্রতিটা মুসলিম বিশ্ব দেখেছে কারা মুসলমানদের বন্ধু আর কারা শত্রু। মানবতার বুলি আওড়িয়ে কারা নিরপরাধ শিশুদের হত্যায় উৎসাহ দেয়। প্রতিটা রাষ্ট্রকে দেখতে হবে প্যালেস্টাইনিদের চোখ দিয়ে। তারা যাদেরকে ভালো বলবে তারা ভালো আর যাদেরকে খারাপ বলবে তারা খারাপ। সেভাবেই সম্পর্ক পুনর্গঠন হবে।

৭. ফিলিস্তিনের ওপর আগ্রাসন চালানোয় তথা কথিত ইসরাইলকে সমর্থন দিয়েছে ২৫টির মতো দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, আলবেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভেনিয়া, ব্রাজিল, বুলগেরিয়া, কানাডা, কলম্বিয়া, সাইপ্রাস, চেক রিপাবলিক, জর্জিয়া, জার্মানি, গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, হাঙ্গেরি, ইতালি, লিথুনিয়া, মালদোভা, নেদারল্যান্ডস, মেসিডোনিয়া, প্যারাগুয়ে, স্লোভেনিয়া, ইউক্রেন এবং উরুগুয়ের।
হিটলারের সহযোগী এডলফ আইখম্যান যখন ধরা পড়েন তাকে হত্যার প্রস্তুতি শেষে মৃত্যুর পুর্বে শেষ ইচ্ছা জানতে চাইলে ইহুদী ধর্ম গ্রহনের কারন হিসেবে বললেন ” মৃত্যুর আগে দেখে যেতে চাই, আরেকটা ইহুদী মারা গেল।”হিটলারের সহযোগী এডলফ আইখম্যান যখন ধরা পড়েন তাকে হত্যার প্রস্তুতি শেষে মৃত্যুর পুর্বে শেষ ইচ্ছা জানতে চাইলে ইহুদী ধর্ম গ্রহনের কারন হিসেবে বললেন ” মৃত্যুর আগে দেখে যেতে চাই, আরেকটা ইহুদী মারা গেল।”

৮. পশ্চিমা মিডিয়ায় ইসরাইলকে যতটা অপরাজেয় বা অপ্রতিরোধ্য হিসেবে দেখানো হয় আসলে তারা ততটা না। তারা প্রচণ্ড রকমের ভীতু একটা দেশ। ইহুদীদের মধ্যে এখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং তারা অধিকৃত সবগুলো শহরেই ইঁদুরের মত বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছে ফিলিস্তিনি ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়ে! ভালো রেঞ্জের কিছু মিসাইল হলেই ইজরায়েলকে থামানো সম্ভব।

৯. হামাসকে টেকনোলজি দিয়ে সাহায্য করেছে ইরান, গোয়েন্দা টিম দিয়ে সাহায্য করছে আরো কয়েকটা মুসলিম দেশ। ট্রেনিং দিচ্ছে সিরিয়ায়। ফলে এদেশ গুলোর মাঝে প্যালেস্টাইনের কারনে একটা কানেকশন তৈরি হবে। এক হয়ে গাজা উদ্ধারে সর্বাত্মক সহায়তা করতে পারে যেভাবে তুর্কি আজারবাইজানকে করেছে।

১০. এখন থেকে হয়তো মুসলিম শিশুরা ফিলিস্তিনি শিশুদের মত সাহসী হতে চাইবে। হয়তো এই ফিলিস্তিন ইস্যু সারা বিশ্বের মুসলিমদের এক করে তুলতে পারে।

আল-আকসা আমাদের উদ্ধার করতেই হবে এবং তা যে কোন মূল্যে। সাবধান তুমি কারো মিষ্টি কথার ধোকায় পড়ো না। ইহুদীরা কখনোই আমাদের বন্ধু ছিল না ভবিষ্যতে কখনো হবে না।।

১১. ইহুদিবাদী ইসরাইল বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে রাজধানী করার লক্ষ্যে এই শহরে ইহুদিবাদীদের সংখ্যা ও বসতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং ইসলামী ও অ-ইহুদি ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে ধ্বংস করে গোটা শহরের ইহুদিকরণ করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে মেতে উঠেছে। এ সময়ও নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিরা ওই পবিত্র মসজিদের ভেতর ও বাহির থেকে  অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ পন্থায় ইট-পাথর, জুতা ও চেয়ার নিক্ষেপ করে পাল্টা হামলা চালিয়ে সন্ত্রাসী হানাদারদের মোকাবেলা করতে সক্ষম হন। পবিত্র আল-আকসা মসজিদ ও এর আশপাশের অঞ্চলকে ইহুদিবাদী দখলদারিত্ব থেকে রক্ষাসহ এ অঞ্চলের ইসলামী পরিচিতি টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের এই প্রাণপণ সংগ্রাম গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী এবং সংগ্রামীদের প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।


১২. আরও একটি লক্ষণীয় দিক হল এই প্রথম সংগ্রামী ফিলিস্তিনিরা মাত্র কয়েক মিনিটে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইল অধিকৃত শহরগুলোতে নিক্ষেপ করতে সক্ষম হয়েছে এবং এইসব ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিব ও এমনকি তেলআবিব থেকেও অনেক দূরে হাইফা শহরেও আঘাত হেনেছে! অথচ এক সময় এই ফিলিস্তিনিরা কেবল পাথর ছুঁড়ে ইসরাইল বিরোধী গণ সংগ্রাম বা ইন্তিফাদা শুরু করেছিল! ইসরাইল এই বার্তাও পেল যে হামাসের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের যে কোনো টার্গেটে ও শহরে আঘাত হানতে সক্ষম এবং ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সেসব ঠেকাতে সক্ষম নয়। হামাস ও জিহাদ এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস বলেছে, জর্দান নদীর পশ্চিমতীর, গাজা উপত্যকা বা ফিলিস্তিনের অন্য যে কোনো স্থানে সংঘাতের ঘটনায় ইহুদিবাদী ইসরাইলের একক আধিপত্যের যুগ শেষ হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনিরাও এখন তেল আবিবকে দাঁতভাঙা জবাব দিচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যমগুলোতে নিচের হ্যাসট্যাগ সমুহ ব্যবহার করুন।

𝗜’𝗺 𝗳𝗿𝗼𝗺 𝗕𝗮𝗻𝗴𝗹𝗮𝗱𝗲𝘀𝗵 𝗮𝗻𝗱 𝘀𝘂𝗽𝗽𝗼𝗿𝘁 𝗣𝗮𝗹𝗲𝘀𝘁𝗶𝗻𝗲
#BangladeshStandsWithPalestine
#SaveTheMuslims
#PrayForPalestine
#FreePalestine
#AlAqsa
#SavePalestine
#SaveTheMuslims
#StopConspiracyAgainstIslam
#GazaUnderAttack
#AlAqsaUnderAttack
#FreePalestine
#StandForPalestine
#StopTerrorismAgainstMuslims
#RaiseVoiceAgainstIsrealiTerrorism
#StopTerrorismAgainstMuslims
#StopConspiracyAgainstIslam
#stopIsraeliTerrorism
#GazaUnderAttack
#AlAqsaUnderAttack
#WeStandWithPalestine
#PalestineWillBeFree
#FreePalestine
#TerroristIsrael
#MilitantIsrael

পোষ্টটি প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করতে পারেন...
  • 411
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!