ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা অব্যাহত থাকলে আইন-আদালত কিছু থাকবে না

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা অব্যাহত থাকলে আইন-আদালত কিছু থাকবে না

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আদালতের এক বিচারককে গালাগাল ও অশালীন আচরণের ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। আদালত উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, বিচারকের সঙ্গে আইনজীবীরা যে আচরণ করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে আইন-আদালত বলে কিছু থাকবে না। আদালত তো শক্তি প্রদর্শনের জায়গা নয়। এটা আমাদের জুডিশিয়ারির অস্তিত্বের বিষয়। ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আগুন থামান। অন্যথায় এই আগুনে সবাইকে জ্বলতে হবে। বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার এই মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে বিচারককে গালাগাল এবং অশালীন আচরণের ঘটনার যে ভিডিও ছড়িয়েছে, তা দ্রুত অপসারণ করতে বিটিআরসিকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

মঙ্গলবার শুনানির শুরুতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বার নেতাদের পক্ষে সুপ্রিমকোর্ট বার সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, আদালত অবমাননার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য দুই মাস সময় প্রার্থনা করছি। আদালত বলেন, আপনারা কি কনটেস্ট করতে চাচ্ছেন? উত্তরে আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, আমরা ব্যাখ্যা দেব বলে সময় প্রার্থনা করছি। আদালত বলেন, আদালত অবমাননার রুল জারির পর থেকে এ বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নজির দেখেছি, পড়েছি। পৃথিবীর কোথাও আদালত কক্ষে এ রকম ঘটনা ঘটেনি। সভ্যতাবিবর্জিত ঘটনা এটি। আমরা কোন দিকে যাচ্ছি, সেটা আমাদের সবার ভাবার বিষয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বার সভাপতিকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন, আপনি তো শুধু আইনজীবী নন। আপনি আইনজীবীদের নেতা। মানুষ যখন বড় পদে যায়, তখন আরও বিনয়ী হয়। তার দায়িত্ব বেড়ে যায়। এ সময় আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বার সভাপতি আইনজীবী সমিতির সব সদস্যের পক্ষে কথা বলেছেন। এটা বারের সিদ্ধান্ত ছিল। উনি ব্যক্তিগত স্বার্থে এটা করেননি। তিনি সাধারণ আইনজীবীদের স্বার্থে কথা বলেছেন।

হাইকোর্ট বলেন, আদালত তো শক্তি প্রদর্শনের জায়গা নয়। শুধু ভোটের চিন্তা করবেন না। আমাদের সবার ইমেজের বিষয়। আদালতকে অসম্মান করতে থাকলে এটা কারও জন্য শুভ হবে না। আদালতকে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। তাহলে আপনারা সম্মান পাবেন। আদালত না থাকলে আপনারাও থাকবেন না।

অনেকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন আদালত। এ সময় সুপ্রিমকোর্ট বার সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির ও অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য সময় আবেদন করেন। এ সময় আদালত বলেন, আমরা সময় দিতে পারি, তবে আপনারা পরিস্থিতি কুলডাউন করুন। কোনো কোর্ট বর্জন করবেন না।

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন, সুপ্রিমকোর্ট বার সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুন নুর দুলাল, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা, অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জরুল হক আদালতকে বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছি। কাজ শুরু করেছি। আমাদের সময় দিন।’

আদালত বলেন, ‘আপনারা পরিস্থিতি কুলডাউন করুন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আমরা কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখব। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা জুডিশিয়ারিকে ধ্বংস হতে দিতে পারি না। আমরা প্রতিমুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করছি।’

এ সময় সুপ্রিমকোর্ট বার সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির আদালতকে উদ্দেশ করে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় আপনারা আইনজীবীদের তলব করলেন। আদালত অবমাননার রুল জারি করলেন। কিন্তু বিচারকদের প্রতি আদালত অবমাননার রুল জারি করলেন না। বিচারকদের বিরুদ্ধেও আদালত অবমাননার রুল জারি করুন। আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারক খুব খারাপ আচরণ করেছেন। আমরা কতদিন এ আচরণ সহ্য করব। এ সময় আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা সুপ্রিমকোর্ট বার সভাপতির বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে উচ্চৈঃস্বরে ঠিক ঠিক বলে উঠেন। তখন আদালত বলেন, এটা সত্যিই অপ্রত্যাশিত। এখানে কি বার আর বেঞ্চের যুদ্ধ শুরু হয়েছে? এজলাস কক্ষে কি বাইরে থেকে লোক ঢুকেছে? সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবীরা তো এ রকম করতে পারে না। এ ঘটনায় অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিনও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা এটা করতে পারেন না। সবাই চুপ করুন।

আদালত বলেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। বিচারক ভুল করতে পারেন। এর জন্য প্রধান বিচারপতি, আইনমন্ত্রী আছেন। তাদের কাছে বিচার চাইতে পারতেন। আদালত তো শক্তি প্রদর্শনের জায়গা নয়। এটা আমাদের জুডিশিয়ারির অস্তিত্বের বিষয়। পরিস্থিতি কুলডাউন করুন। আপনারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আগুন থামান। অন্যথায় এই আগুনে সবাইকে জ্বলতে হবে। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনজীবী নেতাদের সমঝোতার প্রচেষ্টা চালানোর পরামর্শ দিয়ে আদালত বলেন, সমঝোতার চেষ্টা করুন। সমঝোতা হলে আমরা অন্যভাবে চিন্তা করব। পরে আদালত সময় আবেদন গ্রহণ করে পরবর্তী শুনানির জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারি দিন নির্ধারণ করে দেন।

শুনানির পুরো সময় এজলাস কক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তানভীর আহমেদ ভূঞা, সম্পাদক (প্রশাসন) অ্যাডভোকেট মো. আক্কাস আলী ও অ্যাডভোকেট জুবায়ের ইসলাম। আরও উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. গোলাম রাব্বানী, সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন পরে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে আদালত ও আইনজীবীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমরা ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা প্রার্থনা করেছি। আদালত এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ঘটনার সূত্রপাত ১ ডিসেম্বর। সেদিন ছিল জেলা জজ আদালতের বছরের শেষ কার্যদিবস। একটি মামলা দায়েরকে কেন্দ্র করে আইনজীবী সমিতির নেতাসহ একাধিক আইনজীবীর সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ ফারুকের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর এক মাসের অবকাশের মধ্যে জেলা আইনজীবী সমিতি ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ ফারুক এবং জেলা জজ শারমিন নিগারের অপসারণের দাবি তোলে। তাদের আদালত বর্জনের ঘোষণাও দেয়।

ছুটি শেষে আদালত খোলার পর ১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে গিয়ে ফের বিচারক ফারুকের সঙ্গে তর্কে জড়ান আইনজীবীরা। ওই ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন আইনজীবী আদালত বর্জনের কথা বলে বিচারককে এজলাস থেকে নেমে যেতে বলেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে আইনজীবীরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এ সময় তারা বিচারকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং উচ্চৈঃস্বরে গলাগাল করেন। পরদিন ২ জানুয়ারি বিচারক ফারুক এই আইনজীবীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়ে চিঠি দেন সুপ্রিমকোর্টে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া বারের সভাপতিসহ তিনজনকে তলবের আদেশ দেন। অপরদিকে আদালত বর্জনের কর্মসূচি পালনের সময় জেলা জজ শারমিন নিগারের নামে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ ওঠে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় এই নারী বিচারকও সুপ্রিমকোর্টে চিঠি দিয়ে প্রতিকার চান। এ পরিপ্রেক্ষিতে বারের সাধারণ সম্পাদকসহ ২১ আইনজীবীকে ২৩ জানুয়ারি তলব করেন হাইকোর্ট।

পোষ্টটি প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করতে পারেন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!