রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা

রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

দেশের বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি প্রশাসন। পাইকারি বাজারে সরবরাহ চেইন এখনো সিন্ডিকেটের হাতে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী এই সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে রমজান মাসে ভোগ্যপণ্যের দাম আরও এক দফা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর। ছোলা, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেলসহ প্রধান কয়েকটি পণ্যের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় রমজান মাসে। তবে এলসি সংকটে আমদানি কমে যাওয়ায় আসন্ন রমজান অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হতে যাচ্ছে ভোক্তাদের জন্য। এখনই উদ্যোগ নেওয়া না হলে রোজার আগে পণ্যবাজার নতুন করে অস্থির হয়ে উঠতে পারে। খোদ ব্যবসায়ীরাই এমনটা মনে করছেন।

এদিকে চট্টগ্রামে বাজারে দফায় দফায় বেড়ে চলেছে নিত্যপণ্যের দাম। আজ এক পণ্যের দাম বাড়লে কাল বাড়ে আরেক পণ্যের দাম। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। কিছু সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী। তবে এক সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা কমেছে ডিম ও কাঁচামরিচের দাম। পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কিছুটা কমলেও খুচরা বাজারে এর প্রভাব নেই। মাছ ও মাংসের দাম বাড়ার ফলে ক্রেতারা এখন ঝুঁকছেন সবজির দিকে। ফলে সবজির দামও এখন লাগামহীন।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের মোট পণ্যের প্রায় অর্ধেকই নিয়ন্ত্রিত হয় এ বাজার থেকে। এসব পণ্য আমদানির সঙ্গে যুক্ত চট্টগ্রামভিত্তিক একাধিক শিল্প গ্রুপ। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের তারল্য সংকট ছাড়াও ডলার সংকটের কারণে আমদানি ভোগ্যপণ্য বন্দর থেকে খালাস করতে বিলম্ব হওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে রোজায় পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা পাইকারি বাজার থেকে রমজানের নিত্যপণ্য কিনে মজুত করা শুরু করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে আমদানিকারক ও পাইকারি বাজারে ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল রয়েছে। আমদানিকারকরা সব ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। রমজান আসার আগেই চড়া ডাল ও ছোলার বাজার। দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের ডালের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা করেই ডালের দাম বাড়িয়েছেন। পাইকারি বাজারে ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা কেজি দরে, যা দুই সপ্তাহ আগে ছিল ৭৬ টাকা। আর খুচরা বাজারে ছোলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯৫ টাকার বেশি।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডলার সংকটের কারণে আমদানি-পরবর্তী কিছু ভোগ্যপণ্যের খালাস নিয়ে জটিলতা তৈরি হলেও এখন সরকারি নানান সিদ্ধান্তের কারণে তা কেটে গেছে। বড় আমদানিকারকরাও নতুন করে এলসি (ঋণপত্র) খুলেছেন। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চিনি ও ছোলার সংকট হবে না বলে আশা করছেন অনেকে।

পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কিছুটা কমেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে মনপ্রতি ১শ টাকা বেড়ে সয়াবিন তেল ৬ হাজার ৪৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া মনপ্রতি ১৫০ টাকা কমে পামতেল ৪ হাজার ৮৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সুপার সয়াবিন মনপ্রতি আগের ৫ হাজার ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে খুচরা বাজারে প্রতিলিটার খুচরা তেল ১৯০ থেকে ১৯২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল খুচরায় ১৮৬ টাকা ও পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ৯শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি পলিব্যাগ লিটারপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা।

এছাড়া প্রতিকেজি চিনি পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা। আর খুচরা বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১১৮ টাকা। ভারতীয় গম বিক্রি হচ্ছে প্রতিমন ১ হাজার ৮৫০ টাকায়। চিনি প্রতিমন ৩ হাজার ৯৫০ টাকা, ভারতীয় মরিচ কেজি ৪৬৯ টাকা, হলুদ ১১০ টাকা, রসুন ১১০ টাকা। ভোগ্যপণ্যের মধ্যে শুধু পেঁয়াজের দাম কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। ভালোমানের ভারতীয় পেঁয়াজ পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৮ টাকা। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা দরে। দেশি পেঁয়াজ আরও ৫ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে।

এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে চালের। প্রতি বস্তা মোটা সিদ্ধ চালের দাম ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা। চলতি সপ্তাহে তা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকা। সিদ্ধ মিনিকেটের দাম আগে ছিল ২ হাজার ৮০০ টাকা। এ সপ্তাহে তা ২ হাজার ৯০০ টাকা। গুটি স্বর্ণার দাম ছিল ২ হাজার ৩০০ টাকা, এখন ২ হাজার ৪০০ টাকা। ভারতীয় স্বর্ণার দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪৫০ টাকা হয়েছে। এছাড়া গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে পারি সিদ্ধ জাতের চালের দাম ২ হাজার ৪৫০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬৫০ টাকা হয়েছে। খুচরা বাজারেও অস্থির চালের বাজার।

খাতুনগঞ্জের নিউ আমানত স্টোরের মালিক কামরুল হাসান রাজু জানান, টানা কয়েক মাস ধরে অস্থির ভোগ্যপণ্যের বাজার। বাজার অস্থিতিশীলকারী সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়। প্রশাসন পণ্যের সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। তাই সিন্ডিকেট রমজান মাসে ভোগ্যপণ্যের বাজার আবারও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

বাজারদর : গত দুই-তিন সপ্তাহ রেকর্ড ভেঙে ২৩০-২৪০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে ব্রয়লার মুরগি। এখন বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা । এ নিয়ে দেড় মাসের ব্যবধানে ব্রয়লারের দাম কেজিতে বেড়েছে প্রায় ১০০ টাকার বেশি। বাঁধাকপি ও ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকা কেজি। মিষ্টি কুমড়ার কেজি ৪০-৫০ টাকা, চালকুমড়া পিস ৫০-৬০ টাকা। লাউ আকারভেদে ৬০-৭০ টাকা। লম্বা ও গোল বেগুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০-৮০ টাকা। টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৫০ টাকা। শিম ৫০-৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৮০-১০০ টাকা, পটোল ৮০, করলা ৭০-৯০ টাকা ও আলু ২৭-৩০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বরবটি ৮০-১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৫৫-৭০ টাকা ও ঝিঙ্গা ৭০-১০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

Loading

পোষ্টটি প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করতে পারেন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!