শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের নির্যাতনে ১০ কর্মকর্তা কর্মচারী পুলিশ হেফাজতে

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের নির্যাতনে ১০ কর্মকর্তা কর্মচারী পুলিশ হেফাজতে

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অমানুষিক নির্যাতন ও মারপিটে তিন কিশোর নিহত ও ১৪ জন আহতের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্বজনরা। তারা ওই কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের অত্যাচার-নির্যাতনের নানান চিত্র তুলে ধরছেন। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে হতাহতের ঘটনায় ওই কেন্দ্রের ১০ কর্মকর্তা, কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। এছাড়াও সমাজসেবা অধিদফতর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তা ও আনসার সদস্যদের অমানুষিক নির্যাতন ও মারপিটে তিন কিশোর নিহত হয়। আহত হয় আরও অন্তত ১৪ জন। ওইদিন দুপুরে এ ঘটনা ঘটলেও সন্ধ্যারাতে মরদেহ হাসপাতালে আনার পর ঘটনা জানাজানি হয়। প্রথমে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা এটিকে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা দাবি করলেও পরবর্তীতে নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও প্রাথমিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আনসার সদস্য ও তাদের নির্দেশে কয়েকজন কিশোর অন্তত ১৮ জনকে বেধড়ক মারপিট করেন। মারপিট ও নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের ফেলে রাখা হয়। কয়েকজন অচেতন থাকায় তারা অজ্ঞান হয়ে গেছে মনে করেন। তবে পরে বুঝতে পারেন তিনজন মারা গেছে। এরপর সন্ধ্যারাতে এক এক করে তাদের মরদেহ হাসপাতালে এনে রাখা হয়।

নিহতরা হচ্ছে- বগুড়ার শিবগঞ্জের তালিবপুর পূর্বপাড়ার নান্নু প্রামাণিকের ছেলে নাঈম হোসেন (১৭), একই জেলার শেরপুর উপজেলার মহিপুর গ্রামের আলহাজ নুরুল ইসলাম নুরুর ছেলে রাসেল ওরফে সুজন (১৮) এবং খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮)।

এদিকে ঘটনার পর রাতে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি বন্দি কিশোররা তুলে ধরেন তাদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা। তারা জানান, ঘটনার সূত্রপাত ৩ আগস্ট। ঈদের দুদিন পর। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের আনসার সদস্য নূর ইসলাম কয়েকজন কিশোরের চুল কেটে দিতে চান। কিন্তু কিশোররা চুল কাটতে রাজি না হওয়ায় তিনি কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেন- ওই কিশোররা নেশা করে। এর প্রতিবাদে ওই দিন কয়েকজন কিশোর তাকে মারপিট করে।

আহত কিশোরদের দাবি, ওই ঘটনার সূত্র ধরেই বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ১৮ জন বন্দিকে রুম থেকে বাইরে বের করে আনা হয়। এরপর বিকেল ৩টা পর্যন্ত পালাক্রমে তাদেরকে লাঠিসোটা, রড ইত্যাদি দিয়ে বেধড়ক মারপিট করা হয়। এভাবে মারপিটের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের ফেলে রাখা হয়। পরে তিনজন মারা গেলে সন্ধ্যারাতে তাদের মরদেহ যশোর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বন্দি চুয়াডাঙ্গার পাভেল বলে, ৩ আগস্টের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে আমাদের অফিসে ডাকা হয় এবং এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। আমরা ঘটনার সবকিছু জানানোর এক পর্যায়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, প্রবেশন অফিসার মুশফিকসহ অন্যান্য স্যাররা মারপিটে অংশ নেন।

আহত আরেক বন্দি কিশোর নোয়াখালীর জাবেদ হোসেন বলে, স্যাররা ও অন্য বন্দি কিশোররা আমাদের লোহার পাইপ, বাটাম দিয়ে কুকুরের মতো মেরেছে। তারা জানালার গ্রিলের ভেতর আমাদের হাত ঢুকিয়ে বেঁধে মুখের ভেতর কাপড় দিয়ে এবং পা বেঁধে মারধর করেন। অচেতন হয়ে গেলে আমাদের কাউকে রুমের ভেতর আবার কাউকে বাইরে গাছ তলায় ফেলে আসেন। জ্ঞান ফিরলে ফের একই কায়দায় মারপিট করেছেন।

যশোরের বসুন্দিয়া এলাকার বন্দি মারুফ হোসেন ঈষান বলে, নিহত রাসেল আর আমি একই রুমে থাকতাম। আগামী মাসেই তার জামিনে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। স্যারদের বেদম মারপিট আর চিকিৎসা না পেয়ে সে মারা গেছে। তার অভিযোগ- প্রবেশন অফিসার মারধরের সময় বলেন, তোদের বেশি বাড় বেড়েছে। জেল পলাতক হিসেবে তোদের বিরুদ্ধে মামলা করে ক্রসফায়ারে দেয়া হবে।

ঈষানের মামা রমজান আলী জানান, ইতোপূর্বেও শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে নির্যাতন-মারপিটের ঘটনা ঘটেছে। জানালার বাইরে হাত বের করে ধরে রেখে পেছনে বেধড়ক পেটানো হয়েছে।

যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, দুইপক্ষের বক্তব্যে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে সংঘর্ষে নয়, মারপিটেই তিনজন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়েছে। কেন্দ্রের মধ্যে কেউ অপরাধ করলে সেখানে অভ্যন্তরীণ শাস্তির রেওয়াজ আছে। সেটি করতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটতে পারে। বিষয়টি আমরা যাচাই-বাছাই করছি। তিনি বলেন, এ ঘটনায় কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, সাইকো সোস্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমানসহ ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন বন্দি নিহত ও অন্তত ১৪ জন আহতের ঘটনায় দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সমাজসেবা অধিদফতর। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক শেখ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে এই কমিটি গঠন করা হয়। তিন কর্মদিবসের মধ্যে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির দুই সদস্য হলেন- সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) যুগ্ম সচিব সৈয়দ মো. নূরুল বাসির ও সমাজসেবা অধিদফতরের উপরিচালক (প্রতিষ্ঠান-২) এমএম মাহমুদুল্লাহ।

পোষ্টটি প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করতে পারেন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!