ঢাকা , সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ড্যাপ নিয়ে জনস্বার্থ ও বাসযোগ্যতার বিপন্নতা এবং নাগরিকদের করণীয়

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
  • আপডেটঃ ০৪:৪২:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ মার্চ ২০২৫
  • / ৮৬৩ বার পঠিত

গোষ্ঠীস্বার্থে বারবার ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত বিধিমালার পরিবর্তন, জনস্বার্থ ও বাসযোগ্যতার বিপন্নতা এবং নাগরিকদের করণীয়।

 

আজ মঙ্গলবার (১৮ মার্চ) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে সংবাদ সম্মেলন করেন বিভিন্ন নাগরিক, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠন।

 

অতীতে বিভিন্ন ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠী শহরের পরিকল্পনা ও ইমারত বিধিমালাকে অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করবার অপপ্রয়াস চালিয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে তলানির দিকে গিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশেও ইমারত বিধিমালা এবং ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধন এর নামে ব্যবসায়িক গোষ্ঠী তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় তৎপর হয়ে উঠেছে, যা শহরের বাসযোগ্যতা, জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থকে আরো হুমকিতে ফেলবে। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা রাজউক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এর আগ্রহ, আচরণ ও দায়িত্বশীলতা জনস্বার্থের পরিবর্তে বৈষম্যমূলকভাবে গোষ্ঠীস্বার্থের অনুকূলে পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থান এর পর দেশের সংবিধানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংস্কার হলেও সমগ্র দেশের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের নগরায়ন, নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, ইমারত, নির্মাণ ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার যৌক্তিক কোন সংস্কার হয়নি। বিপরীতে ড্যাপ নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল সবসময়ই অপপ্রচারণা চালিয়েছে। ড্যাপ অচিরেই সংশোধন করা হবে, এই বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়ে ভবন নির্মানে আগ্রহী ভবন মালিকদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ইমারত নকশা ও নির্মাণ সংশ্লিষ্ট অনেক পেশাজীবী নতুন ড্যাপের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ভবন নকশায় আগ্রহী না হয়ে ভবন মালিকদের ভিন্ন বার্তা দেবার চেষ্টা করেছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন এর সাথে সাথেই বারংবার স্বার্থান্বেষী মহলের বাধার কারণে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হতে পারছে না। গত দুটি বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন এর পরপরই রিভিউ কমিটি গড়ে ড্যাপ বাস্তবায়নের মূল শক্তিটাই নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। সরকার উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী মহলের কাছে সামগ্রিক জনস্বার্থ, শহরের বাসযোগ্যতাকে ছাড় দিয়েছে। অনুরূপভাবে বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা ২০০৪ এর সংশোধন করা হয় ২০১৫ সালে, যাতে আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে জনস্বার্থ উপেক্ষা করে নাগরিক সুবিধাদির মানদণ্ড বা স্ট্যান্ডার্ড অনেক কমিয়ে ফেলা হয়েছে, ফলে পরিমাণ কমেছে পার্ক, খেলার মাঠ, বিদ্যালয় প্রভৃতি নাগরিক সুবিধাদিতে।

 

যে কোন শহরের টেকসই পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক জনস্বার্থ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান সম্বলিত ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়ন এবং সেটির কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। ঢাকা যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, পার্ক-খেলার মাঠ সহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধাদি ও পরিসেবার দিক দিয়ে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ অবস্থায় আছে, যার পেছনে নগর পরিকল্পনার সঠিক কৌশল প্রয়োগ না করবার পাশাপাশি ইতিপূর্বে জনঘনত্ব পরিকল্পনা প্রণয়ন না করা এবং বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় এফএআর এর উচ্চ মানের ও দায় আছে। ইতোপূর্বে বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনায় জনঘনত্ব বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও পরিকল্পনার কৌশল হিসেবে তার প্রয়োগ সীমিত পরিসরে দেখা গিয়েছে। পরিকল্পনার মাধ্যমে জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব নির্ধারণ না করা গেলে যে কোন শহর অবাসযোগ্য হতে বাধ্য, ঢাকা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

 

একটি বসবাসযোগ্য শহরে শুধু আবাসন নয়; পরিবেশ, প্রতিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণপরিবহন ইত্যাদি বিষয়েও গুরুত্ব দেয়ার কথা। অথচ আমাদের ব্যবসায়ী মহল কেবল ড্যাপ বাতিল এবং ফার বৃদ্ধির কথাই বলছে। এমনকি ফার বৃদ্ধি করা হলে ভবিষ্যতে ওই এলাকা বসবাসযোগ্য থাকবে কিনা তা নিয়ে কোনো গবেষণা করা হয়নি। রাজউকের নীতিনির্ধারক মহলের অনেকেই নগর পরিকল্পনার গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পারায় স্বার্থান্বেষী মহলের অন্যায় আবদারের কাছে নতি স্বীকার করছেন। আবাসন ব্যবসায়ীদের স্বার্থের সংঘাত এর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ড্যাপ পুনর্মূল্যায়ন কমিটিতে রিহাবের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি বৈষম্যবিরোধী চেতনার প্রতিফলন ঘটায় না। গোষ্ঠীস্বার্থ চিন্তা না করে ঢাকার বাসযোগ্যতা বাড়াতে জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

২০০৮ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় আবাসিক ভবনের জন্য মোটা দাগে রাস্তার প্রশস্থতা ও প্লটের আয়তনের উপর ভিত্তি করে সর্বনিম্ন ‘এফএআর’ মান ৩.১৫ ও সর্বোচ্চ ৬.৫ দেয়া হয়েছিল। বর্তমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় আবাসিক এ৩ (ফ্ল্যাট বা এপার্টমেন্ট) শ্রেণীর জন্য এই মান সর্বোচ্চ ৪.২৫ নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা মে’২০২৪ সালে খসড়া ইমারত বিধিমালায় অনুসরণ করা হয়েছিল। অথচ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে রাজউক কর্তৃক প্রণীত ইমারত বিধিমালার খসড়াতে প্লটভিত্তিক আবাসিক এ৩ ক্যাটাগরির ফার মান ৫.৫ করা হয়েছে, যা প্রায় অবাসযোগ্য ঢাকা শহরের উপর চাপ মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেবে। অথচ বৈশ্বিকভাবেই ছোট আয়তনের প্লটভিত্তিক আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে ফার মান সাধারণত ১ থেকে ৩ এর মধ্যেই হয়ে থাকে। ড্যাপে এলাকাভিত্তিক ফার ও জনঘনত্ব দুই থেকে তিনগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে রাজউক। অথচ সেসব এলাকার নাগরিক সুবিধাদি একই থাকছে। গোষ্ঠীস্বার্থে বিধিমালার ফার মান পরিবর্তন শহরের জন্য বাসযোগ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ বিবেচনায় নিয়ে ফার মান সাধারণত থাকে ১-৩ এর মধ্যে। অথচ প্রস্তাবিত বিধিমালায় ফার মান সর্বোচ্চ ৬, ৭, এমনকি এনএর বা নিয়ন্ত্রণহীন ফার মান প্রস্তাব করা হয়েছে। নগর পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নগর এলাকার ধরন, মান ও অবস্থান অনুযায়ী পরিকল্পনার কৌশল, জনঘনত্ব, ফার মান, উচ্চতা সীমা প্রভৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে।

 

২০২৪ সালের শুরুতে প্রস্তুতকৃত খসড়া ইমারত বিধিমালায় আবাসিক এলাকার ফার মান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার সাথে সংগতি রেখে কেন্দ্রীয় ঢাকা, বহিঃস্থ নগর ও অন্যান্য নগর এলাকার জন্য পৃথক ফার মান দেয়া হয়েছিল। এটা অত্যন্ত বিস্ময়কর যে বর্তমান ইমারত বিধিমালা প্রস্তাবনায় এই এলাকাভিত্তিক প্রস্তাবনা বাদ দেয়া হয়েছে। ভবনের সেটব্যাক দূরত্ব যথাযথ করে ভবনের ভেতর প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের বিষয়টিও উপেক্ষিত বিধিমালার প্রস্তাবনায়।

 

নগরের আবাসিক এলাকায় কিংবা মহল্লাকেন্দ্রিক উন্নয়নে ভবনের উচ্চতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা অতি প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা কৌশল, যার মাধ্যমে পরিকল্পনাগত ও স্থাপত্যগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হয়, যা সারা বিশ্বজুড়েই নগর পরিকল্পনায় অনুসৃত। ইমারত বিধিমালায় আবাসিক ভবনের উচ্চতার সীমার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং ড্যাপে প্রস্তাবিত ন্যূনতম ভূমি আচ্ছাদনের প্রস্তাবনা বাদ দেয়ার পায়তারা চলছে। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ ও পরিকল্পনাবিদদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও ফায়ার আইনের সাথে সংগতি রেখে ছয়তলার উপরের ভবনকে বহুতল ভবন ঘোষণা করবার মাধ্যমে ভবনের অগ্নি ঝুঁকি কমানোর কোন উদ্যোগ নেই ইমারত বিধিমালা সংশোধনে। কাঁচঘেরা বা সম্পূর্ণ আবদ্ধ কিংবা কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবনসমূহ বিদ্যুত চাহিদা অত্যাধিক বাড়িয়ে দেয়; একইসাথে আশেপাশের ভবন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার বায়ু দূষণ ও উষ্ণতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে। এ ধরনের ভবনে যে কোন অগ্নি ও অন্য দূর্ঘটনার ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়।

 

ফলে এ ধরনের কাঁচঘেরা বা সম্পূর্ণ আবদ্ধ কিংবা কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে এই বিধিমালায় সুস্পষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই ধরনের দূষণের কারণে সন্নিহিত ভবনের অধিবাসী কিংবা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অভিযোগ দায়ের, নিষ্পত্তি, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় বিধান সংযুক্ত করতে হবে। বহুতল ভবন এবং বৃহদায়ন ও বিশেষ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের সামগ্রিক চাহিদা ও লোড ক্যালকুলেশন করবার বিধান যুক্ত করতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগের সাথে গ্রীন বিল্ডিং তৈরীর ব্যাপারে ইমারত বিধিমালায় সুস্পষ্ট নীতি ও বিধান অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত ইমারত বিধিমালায় উপর্যুক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

 

বড় শহরের জনঘনত্ব সাধারণত একরপ্রতি ১০০-১০০ জন বা প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫ ৩০ হাজার হয়। এই জনঘনত্বও শহরের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু নগর এলাকায় থাকে, যা শহরের প্রান্তের দিকে ধীরে ধীরে কমতে থাকে। চূড়ান্ত ড্যাপে ঢাকার অপরিকল্পিত এলাকা জিনিজিরা’র জনঘনত্ব কাঠাপ্রতি পরিবারসংখ্যা ১.২ দেয়া থাকলেও ১৮ নভেম্বর এ রাজউক প্রস্তাবিত সংশোধনীতে জনঘনত্ব আড়াই গুণ বেড়ে কাঠাপ্রতি পরিবারসংখ্যা ৩.০ প্রস্তাব করা হয়েছে। এই এলাকার আগে প্রস্তাবিত এফএআর মান ১.৩ থেকে আড়াই গুণ বৃদ্ধি করে প্রস্তাব করা হয়েছে ৩.৩। তেমনিভাবে বাড্ডার ফার ড্যাপে দেয়া ছিল ২, যা ১.৭ গুণ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩.৪। বাড্ডার কাঠাপ্রতি পরিবারসংখ্যা ড্যাপে ১.৬ থাকলে এখন প্রস্তাব করা হয়েছে ৩, যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১.৯ গুণ। এভাবেই ড্যাপ সংশোধনের নামে বিভিন্ন এলাকার ফার মান ও জনঘনত্ব বাড়িয়ে ফেলে নগরকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে।

 

এমনকি ড্যাপ সংশোধনের নামে গ্রামীণ এলাকায় জনঘনত্ব প্রস্তাব করা হয়েছে একরপ্রতি ২০০ জন বা প্রতি বর্গকিমি এ প্রায় ৫০ হাজার জন। অথচ বিশ্বে বাসযোগ্য মেগা শহরে জনসংখ্যা থাকে ২৫-৩০ হাজার এর মধ্যে। এভাবেই ড্যাপ সংশোধনের প্রস্তাবনার সাথে বৈশ্বিক নগর পরিকল্পনার নীতি, মান ও কৌশলের কোন ধরনেরই সম্পর্ক নেই, ফল ঢাকা হয়ে পড়বে আরো অবাসযোগ্য।

 

একইসাথে ওয়েবসাইটে আপলোডকৃত প্লটভিত্তিক ফার সূচকে A3 (ফ্ল্যাট ও এপার্টমেন্ট বাড়ি) ক্যাটাগরির ফার মানসমূহ যেভাবে অপরিপক্কভাবে কেটে দিয়ে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে, তা দুরভিসন্ধিমূলক। ব্লক ডেভেলপমেন্ট এর ক্ষেত্রেএলাকাভিত্তিক ফার বোনাস সাধারণত ১৫ ২০ শতাংশ হয়ে থাকে। অথচ রাজউক এলাকাভিত্তিক ফার মান এর তুলনায় ব্লকভিত্তিক ফার মান ৯০ – ১২০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রস্তাব করেছে, যা বৈশ্বিক পরিকল্পনা কৌশলের সাথে সাংঘর্ষিক। এভাবেই অনেক এলাকারই ফার মান অযাচিতভাবে বেড়েছে। ফলে এসব এলাকার বাসযোগ্যতা আরো সংকটে পড়বে বলে আমরা মনে করি।

 

ইমারত বিধিমালায় প্রস্তাবিত রাস্তার উপর ফার দেবার জন্য চাপ দিচ্ছে স্বার্থান্বেষী মহল। ন্যূনতম এমজিসি বা ভূমি আচ্ছাদন এর প্রস্তাবনা বাদ দিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করতে চায় এই মহল। প্রস্তাবনাসমূহে পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহে খুবই দূর্বলভাবে নিয়ে এসে নগরে ঝুঁকির মাত্রা কমানো ও নাগরিক সুবিধাদি বাড়ানোর উদ্যোগ নেই সংশোধন প্রস্তাবে। পার্ক-খেলার মাঠ-বিদ্যালয় না নির্মাণ করে শহরের জনঘনত্ব বাড়ানোর প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এর সংশোধনী প্রস্তাবে, যা শুধু শহরের ধ্ববংসায়নই বাড়াবে, কমাবে বাসযোগ্যতা।

 

ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নাগরিক সংগঠনসমূহের পক্ষ থেকে প্রস্তাবনাঃ

 

১। ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠীর অনৈতিক চাহিদা পূরণ করতে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ সংশোধন প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

২। ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার যে কোন সংশোধন নাগরিক, পেশাজীবী, কমিউনিটি ও সামাজিক সংগঠনসমূহকে যথাযথ সম্পৃক্ত করবার মাধ্যমে এবং তাদের মতামতের সাপেক্ষে সার্বিক জনকল্যাণ ও শহরের বাসযোগ্যতাকে মাথায় রেখে করতে হবে।

 

৩। বিগত তিন বছরে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এর বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জসমূহের নির্মোহ মূল্যায়ন করতে হবে।

 

৪। ড্যাপে এলাকাভিত্তিক নাগরিক সুবিধাদি যথা স্কুল, হাসপাতাল, পার্ক, খেলার মাঠ প্রভৃতির যে প্রস্তাবনা দেয়া আছে, সেগুলোর বাস্তবায়নের রাজউক, সিটি কর্পোরেশনসহ সরকারী সংস্থাসমূহকে অতি দ্রুত এলাকাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

৫। পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়নে আবাসন ব্যবসায়ীসহ স্বার্থের সংঘাত আছে, এমন কাউকেই অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

 

৬। নগর পরিকল্পনার সার্বিক বিষয়াদি আমলে নিয়ে জনস্বার্থ ও পরিবেশ-প্রতিবেশ টেকসই করতে পরিকল্পনাবিদদের মতামতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে এবং পরিকল্পনাবিদদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনৈতিক প্রভাব খাটানো যাবে না।

 

বিগত সময়ে গোষ্ঠীস্বার্থে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পরিকল্পনায় যেসকল পরিবর্তন করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সঠিক তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করবার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

অর্থআদালতডটকম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবহার হতে বিরত থাকুন।

ড্যাপ নিয়ে জনস্বার্থ ও বাসযোগ্যতার বিপন্নতা এবং নাগরিকদের করণীয়

আপডেটঃ ০৪:৪২:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ মার্চ ২০২৫

গোষ্ঠীস্বার্থে বারবার ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত বিধিমালার পরিবর্তন, জনস্বার্থ ও বাসযোগ্যতার বিপন্নতা এবং নাগরিকদের করণীয়।

 

আজ মঙ্গলবার (১৮ মার্চ) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে সংবাদ সম্মেলন করেন বিভিন্ন নাগরিক, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠন।

 

অতীতে বিভিন্ন ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠী শহরের পরিকল্পনা ও ইমারত বিধিমালাকে অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করবার অপপ্রয়াস চালিয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে তলানির দিকে গিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশেও ইমারত বিধিমালা এবং ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধন এর নামে ব্যবসায়িক গোষ্ঠী তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় তৎপর হয়ে উঠেছে, যা শহরের বাসযোগ্যতা, জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থকে আরো হুমকিতে ফেলবে। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা রাজউক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এর আগ্রহ, আচরণ ও দায়িত্বশীলতা জনস্বার্থের পরিবর্তে বৈষম্যমূলকভাবে গোষ্ঠীস্বার্থের অনুকূলে পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থান এর পর দেশের সংবিধানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংস্কার হলেও সমগ্র দেশের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের নগরায়ন, নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, ইমারত, নির্মাণ ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার যৌক্তিক কোন সংস্কার হয়নি। বিপরীতে ড্যাপ নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল সবসময়ই অপপ্রচারণা চালিয়েছে। ড্যাপ অচিরেই সংশোধন করা হবে, এই বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়ে ভবন নির্মানে আগ্রহী ভবন মালিকদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ইমারত নকশা ও নির্মাণ সংশ্লিষ্ট অনেক পেশাজীবী নতুন ড্যাপের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ভবন নকশায় আগ্রহী না হয়ে ভবন মালিকদের ভিন্ন বার্তা দেবার চেষ্টা করেছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন এর সাথে সাথেই বারংবার স্বার্থান্বেষী মহলের বাধার কারণে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হতে পারছে না। গত দুটি বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন এর পরপরই রিভিউ কমিটি গড়ে ড্যাপ বাস্তবায়নের মূল শক্তিটাই নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। সরকার উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী মহলের কাছে সামগ্রিক জনস্বার্থ, শহরের বাসযোগ্যতাকে ছাড় দিয়েছে। অনুরূপভাবে বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা ২০০৪ এর সংশোধন করা হয় ২০১৫ সালে, যাতে আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে জনস্বার্থ উপেক্ষা করে নাগরিক সুবিধাদির মানদণ্ড বা স্ট্যান্ডার্ড অনেক কমিয়ে ফেলা হয়েছে, ফলে পরিমাণ কমেছে পার্ক, খেলার মাঠ, বিদ্যালয় প্রভৃতি নাগরিক সুবিধাদিতে।

 

যে কোন শহরের টেকসই পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক জনস্বার্থ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান সম্বলিত ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়ন এবং সেটির কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। ঢাকা যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, পার্ক-খেলার মাঠ সহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধাদি ও পরিসেবার দিক দিয়ে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ অবস্থায় আছে, যার পেছনে নগর পরিকল্পনার সঠিক কৌশল প্রয়োগ না করবার পাশাপাশি ইতিপূর্বে জনঘনত্ব পরিকল্পনা প্রণয়ন না করা এবং বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় এফএআর এর উচ্চ মানের ও দায় আছে। ইতোপূর্বে বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনায় জনঘনত্ব বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও পরিকল্পনার কৌশল হিসেবে তার প্রয়োগ সীমিত পরিসরে দেখা গিয়েছে। পরিকল্পনার মাধ্যমে জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব নির্ধারণ না করা গেলে যে কোন শহর অবাসযোগ্য হতে বাধ্য, ঢাকা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

 

একটি বসবাসযোগ্য শহরে শুধু আবাসন নয়; পরিবেশ, প্রতিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণপরিবহন ইত্যাদি বিষয়েও গুরুত্ব দেয়ার কথা। অথচ আমাদের ব্যবসায়ী মহল কেবল ড্যাপ বাতিল এবং ফার বৃদ্ধির কথাই বলছে। এমনকি ফার বৃদ্ধি করা হলে ভবিষ্যতে ওই এলাকা বসবাসযোগ্য থাকবে কিনা তা নিয়ে কোনো গবেষণা করা হয়নি। রাজউকের নীতিনির্ধারক মহলের অনেকেই নগর পরিকল্পনার গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পারায় স্বার্থান্বেষী মহলের অন্যায় আবদারের কাছে নতি স্বীকার করছেন। আবাসন ব্যবসায়ীদের স্বার্থের সংঘাত এর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ড্যাপ পুনর্মূল্যায়ন কমিটিতে রিহাবের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি বৈষম্যবিরোধী চেতনার প্রতিফলন ঘটায় না। গোষ্ঠীস্বার্থ চিন্তা না করে ঢাকার বাসযোগ্যতা বাড়াতে জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

২০০৮ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় আবাসিক ভবনের জন্য মোটা দাগে রাস্তার প্রশস্থতা ও প্লটের আয়তনের উপর ভিত্তি করে সর্বনিম্ন ‘এফএআর’ মান ৩.১৫ ও সর্বোচ্চ ৬.৫ দেয়া হয়েছিল। বর্তমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় আবাসিক এ৩ (ফ্ল্যাট বা এপার্টমেন্ট) শ্রেণীর জন্য এই মান সর্বোচ্চ ৪.২৫ নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা মে’২০২৪ সালে খসড়া ইমারত বিধিমালায় অনুসরণ করা হয়েছিল। অথচ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে রাজউক কর্তৃক প্রণীত ইমারত বিধিমালার খসড়াতে প্লটভিত্তিক আবাসিক এ৩ ক্যাটাগরির ফার মান ৫.৫ করা হয়েছে, যা প্রায় অবাসযোগ্য ঢাকা শহরের উপর চাপ মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেবে। অথচ বৈশ্বিকভাবেই ছোট আয়তনের প্লটভিত্তিক আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে ফার মান সাধারণত ১ থেকে ৩ এর মধ্যেই হয়ে থাকে। ড্যাপে এলাকাভিত্তিক ফার ও জনঘনত্ব দুই থেকে তিনগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে রাজউক। অথচ সেসব এলাকার নাগরিক সুবিধাদি একই থাকছে। গোষ্ঠীস্বার্থে বিধিমালার ফার মান পরিবর্তন শহরের জন্য বাসযোগ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ বিবেচনায় নিয়ে ফার মান সাধারণত থাকে ১-৩ এর মধ্যে। অথচ প্রস্তাবিত বিধিমালায় ফার মান সর্বোচ্চ ৬, ৭, এমনকি এনএর বা নিয়ন্ত্রণহীন ফার মান প্রস্তাব করা হয়েছে। নগর পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নগর এলাকার ধরন, মান ও অবস্থান অনুযায়ী পরিকল্পনার কৌশল, জনঘনত্ব, ফার মান, উচ্চতা সীমা প্রভৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে।

 

২০২৪ সালের শুরুতে প্রস্তুতকৃত খসড়া ইমারত বিধিমালায় আবাসিক এলাকার ফার মান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার সাথে সংগতি রেখে কেন্দ্রীয় ঢাকা, বহিঃস্থ নগর ও অন্যান্য নগর এলাকার জন্য পৃথক ফার মান দেয়া হয়েছিল। এটা অত্যন্ত বিস্ময়কর যে বর্তমান ইমারত বিধিমালা প্রস্তাবনায় এই এলাকাভিত্তিক প্রস্তাবনা বাদ দেয়া হয়েছে। ভবনের সেটব্যাক দূরত্ব যথাযথ করে ভবনের ভেতর প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের বিষয়টিও উপেক্ষিত বিধিমালার প্রস্তাবনায়।

 

নগরের আবাসিক এলাকায় কিংবা মহল্লাকেন্দ্রিক উন্নয়নে ভবনের উচ্চতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা অতি প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা কৌশল, যার মাধ্যমে পরিকল্পনাগত ও স্থাপত্যগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হয়, যা সারা বিশ্বজুড়েই নগর পরিকল্পনায় অনুসৃত। ইমারত বিধিমালায় আবাসিক ভবনের উচ্চতার সীমার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং ড্যাপে প্রস্তাবিত ন্যূনতম ভূমি আচ্ছাদনের প্রস্তাবনা বাদ দেয়ার পায়তারা চলছে। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ ও পরিকল্পনাবিদদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও ফায়ার আইনের সাথে সংগতি রেখে ছয়তলার উপরের ভবনকে বহুতল ভবন ঘোষণা করবার মাধ্যমে ভবনের অগ্নি ঝুঁকি কমানোর কোন উদ্যোগ নেই ইমারত বিধিমালা সংশোধনে। কাঁচঘেরা বা সম্পূর্ণ আবদ্ধ কিংবা কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবনসমূহ বিদ্যুত চাহিদা অত্যাধিক বাড়িয়ে দেয়; একইসাথে আশেপাশের ভবন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার বায়ু দূষণ ও উষ্ণতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে। এ ধরনের ভবনে যে কোন অগ্নি ও অন্য দূর্ঘটনার ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়।

 

ফলে এ ধরনের কাঁচঘেরা বা সম্পূর্ণ আবদ্ধ কিংবা কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে এই বিধিমালায় সুস্পষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই ধরনের দূষণের কারণে সন্নিহিত ভবনের অধিবাসী কিংবা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অভিযোগ দায়ের, নিষ্পত্তি, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় বিধান সংযুক্ত করতে হবে। বহুতল ভবন এবং বৃহদায়ন ও বিশেষ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের সামগ্রিক চাহিদা ও লোড ক্যালকুলেশন করবার বিধান যুক্ত করতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগের সাথে গ্রীন বিল্ডিং তৈরীর ব্যাপারে ইমারত বিধিমালায় সুস্পষ্ট নীতি ও বিধান অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত ইমারত বিধিমালায় উপর্যুক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

 

বড় শহরের জনঘনত্ব সাধারণত একরপ্রতি ১০০-১০০ জন বা প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫ ৩০ হাজার হয়। এই জনঘনত্বও শহরের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু নগর এলাকায় থাকে, যা শহরের প্রান্তের দিকে ধীরে ধীরে কমতে থাকে। চূড়ান্ত ড্যাপে ঢাকার অপরিকল্পিত এলাকা জিনিজিরা’র জনঘনত্ব কাঠাপ্রতি পরিবারসংখ্যা ১.২ দেয়া থাকলেও ১৮ নভেম্বর এ রাজউক প্রস্তাবিত সংশোধনীতে জনঘনত্ব আড়াই গুণ বেড়ে কাঠাপ্রতি পরিবারসংখ্যা ৩.০ প্রস্তাব করা হয়েছে। এই এলাকার আগে প্রস্তাবিত এফএআর মান ১.৩ থেকে আড়াই গুণ বৃদ্ধি করে প্রস্তাব করা হয়েছে ৩.৩। তেমনিভাবে বাড্ডার ফার ড্যাপে দেয়া ছিল ২, যা ১.৭ গুণ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩.৪। বাড্ডার কাঠাপ্রতি পরিবারসংখ্যা ড্যাপে ১.৬ থাকলে এখন প্রস্তাব করা হয়েছে ৩, যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১.৯ গুণ। এভাবেই ড্যাপ সংশোধনের নামে বিভিন্ন এলাকার ফার মান ও জনঘনত্ব বাড়িয়ে ফেলে নগরকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে।

 

এমনকি ড্যাপ সংশোধনের নামে গ্রামীণ এলাকায় জনঘনত্ব প্রস্তাব করা হয়েছে একরপ্রতি ২০০ জন বা প্রতি বর্গকিমি এ প্রায় ৫০ হাজার জন। অথচ বিশ্বে বাসযোগ্য মেগা শহরে জনসংখ্যা থাকে ২৫-৩০ হাজার এর মধ্যে। এভাবেই ড্যাপ সংশোধনের প্রস্তাবনার সাথে বৈশ্বিক নগর পরিকল্পনার নীতি, মান ও কৌশলের কোন ধরনেরই সম্পর্ক নেই, ফল ঢাকা হয়ে পড়বে আরো অবাসযোগ্য।

 

একইসাথে ওয়েবসাইটে আপলোডকৃত প্লটভিত্তিক ফার সূচকে A3 (ফ্ল্যাট ও এপার্টমেন্ট বাড়ি) ক্যাটাগরির ফার মানসমূহ যেভাবে অপরিপক্কভাবে কেটে দিয়ে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে, তা দুরভিসন্ধিমূলক। ব্লক ডেভেলপমেন্ট এর ক্ষেত্রেএলাকাভিত্তিক ফার বোনাস সাধারণত ১৫ ২০ শতাংশ হয়ে থাকে। অথচ রাজউক এলাকাভিত্তিক ফার মান এর তুলনায় ব্লকভিত্তিক ফার মান ৯০ – ১২০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রস্তাব করেছে, যা বৈশ্বিক পরিকল্পনা কৌশলের সাথে সাংঘর্ষিক। এভাবেই অনেক এলাকারই ফার মান অযাচিতভাবে বেড়েছে। ফলে এসব এলাকার বাসযোগ্যতা আরো সংকটে পড়বে বলে আমরা মনে করি।

 

ইমারত বিধিমালায় প্রস্তাবিত রাস্তার উপর ফার দেবার জন্য চাপ দিচ্ছে স্বার্থান্বেষী মহল। ন্যূনতম এমজিসি বা ভূমি আচ্ছাদন এর প্রস্তাবনা বাদ দিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করতে চায় এই মহল। প্রস্তাবনাসমূহে পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহে খুবই দূর্বলভাবে নিয়ে এসে নগরে ঝুঁকির মাত্রা কমানো ও নাগরিক সুবিধাদি বাড়ানোর উদ্যোগ নেই সংশোধন প্রস্তাবে। পার্ক-খেলার মাঠ-বিদ্যালয় না নির্মাণ করে শহরের জনঘনত্ব বাড়ানোর প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এর সংশোধনী প্রস্তাবে, যা শুধু শহরের ধ্ববংসায়নই বাড়াবে, কমাবে বাসযোগ্যতা।

 

ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নাগরিক সংগঠনসমূহের পক্ষ থেকে প্রস্তাবনাঃ

 

১। ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠীর অনৈতিক চাহিদা পূরণ করতে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ সংশোধন প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

২। ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার যে কোন সংশোধন নাগরিক, পেশাজীবী, কমিউনিটি ও সামাজিক সংগঠনসমূহকে যথাযথ সম্পৃক্ত করবার মাধ্যমে এবং তাদের মতামতের সাপেক্ষে সার্বিক জনকল্যাণ ও শহরের বাসযোগ্যতাকে মাথায় রেখে করতে হবে।

 

৩। বিগত তিন বছরে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এর বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জসমূহের নির্মোহ মূল্যায়ন করতে হবে।

 

৪। ড্যাপে এলাকাভিত্তিক নাগরিক সুবিধাদি যথা স্কুল, হাসপাতাল, পার্ক, খেলার মাঠ প্রভৃতির যে প্রস্তাবনা দেয়া আছে, সেগুলোর বাস্তবায়নের রাজউক, সিটি কর্পোরেশনসহ সরকারী সংস্থাসমূহকে অতি দ্রুত এলাকাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

৫। পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়নে আবাসন ব্যবসায়ীসহ স্বার্থের সংঘাত আছে, এমন কাউকেই অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

 

৬। নগর পরিকল্পনার সার্বিক বিষয়াদি আমলে নিয়ে জনস্বার্থ ও পরিবেশ-প্রতিবেশ টেকসই করতে পরিকল্পনাবিদদের মতামতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে এবং পরিকল্পনাবিদদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনৈতিক প্রভাব খাটানো যাবে না।

 

বিগত সময়ে গোষ্ঠীস্বার্থে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পরিকল্পনায় যেসকল পরিবর্তন করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সঠিক তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করবার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।