ঢাকা , মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন রূপে এসেছে করোনা,জেএন.১

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
  • আপডেটঃ ১২:১৬:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩
  • / ৯৩৬ বার পঠিত

 

শীতে ফ্লু ভাইরাস, রাইনোভাইরাস এবং শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসের মতো অন্যান্য মৌসুমি ভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যায়। তাদের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে কোভিড-১৯ সৃষ্টিকারী সার্স-কোভ-২ করোনাভাইরাসের আরও একটি পরিবর্তিত উপধরন জেএন.১।

 

আমরা দেখেছি, করোনার অমিক্রন ধরনের বিভিন্ন উপধরন যেমন এইচভি.১, বিএ ২.৮৬ গত বছর ২০২২ এবং চলতি বছরও দাপট দেখিয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রাণবিয়োগও ঘটেছে করোনায় আক্রান্ত লক্ষাধিক মানুষের।

 

এর মধ্যে প্রাণঘাতী ভাইরাস সার্স-কোভ-২–এর এই অতিসংক্রামক জেএন.১ উপধরন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) সতর্ক করে বলেছে, এবারের শীতে জেএন.১-এর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে, যার প্রমাণ ইতিমধ্যেই মিলেছে।

 

এই উপধরন যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বর মাসে ধরা পড়েছিল, যখন এর সংক্রমণের হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এর সংক্রমণ ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এসে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৩ শতাংশে। কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে (২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত) এই সংক্রমণের হার এসে দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশে।

 

সংক্রমণে ডিসেম্বরে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ, যা প্রমাণ করে যে এই উপধরন নিঃসন্দেহে আরও বেশি সংক্রমণশীল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এটিকে কড়া নজরে রেখেছে এবং করোনার এই উপধরনকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা ‘আগ্রহের বৈকল্পিক’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে।

 

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ধরন জেএন.১-এর লক্ষণ আগের ধরনগুলোর মতোই। যেমন জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, স্বাদ বা গন্ধ হারানো, ক্লান্তি ইত্যাদি। এ ছাড়া গুরুতর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, ডায়রিয়া এবং বিভ্রান্ত বোধ করা।

 

সার্স-কোভ-২ ভাইরাস তার আরএনএ-জিনোমের তথ্য অনুযায়ী মোট ৩০ থেকে ৩২টি প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম। যার মধ্যে ‘স্পাইক’ হলো সবচেয়ে আলোচিত একটি প্রোটিন। এটি করোনাভাইরাসের মূল সংক্রামক উপাদান বা অ্যান্টিজেন। প্রতিটি ভাইরাসের গায়ে কাঁটার মতো স্পাইক প্রোটিন থাকে। এরাই মানবশরীরে প্রবেশ করে কোষকে আক্রান্ত করে এবং নানা উপসর্গ সৃষ্টি করে। এসব স্পাইকের মিউটেশন বা চরিত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন কোনো ধরন বা উপধরনের সৃষ্টি হয়। অমিক্রনের একটি উপধরন হলো জেএন.১।

 

রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে ফাঁকি দেওয়ায় জেএন.১ অনেক বেশি কার্যকর। ফলে এর সংক্রমণের হার বেশি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে স্পাইক প্রোটিনকে ভিত্তি করেই প্রচলিত সব প্রতিষেধক তৈরি করা হয়েছে। তবে করোনাভাইরাস খুব চালাক প্রকৃতির জীবাণু। প্রতিরোধী ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য তাদের বড় একটি হাতিয়ার হলো, স্পাইক প্রোটিনের কাঠামোগত পরিবর্তন করা এবং এ কাজ তারা অনায়াসে করে মিউটেশনের মাধ্যমে।

 

প্রাথমিকভাবে অমিক্রন ধরনের প্রধান উপধরন হিসেবে আমরা দেখেছি বিএ.১ থেকে বিএ.৫ পর্যন্ত পাঁচটি রূপ। যার মধ্যে বিএ.২ ছিল বেশ দাপুটে ও ধ্বংসাত্মক। বিএ.২ বা ‘স্টিলথ ধরন’ নামে পরিচিত অমিক্রনের ওই উপধরনের ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ বেশ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। সঙ্গে ভিন্নতর মিউটেশনের ধারায় আরও একটি শাখার উত্থান ঘটেছিল, যা এক্সবিবি নামে অভিহিত। ২০২২ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এদের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ সংক্রমিত হন। মৃত্যু হয় প্রায় আড়াই লাখ মানুষের।

 

সময়ের সঙ্গে বিএ.২ ও এক্সবিবি ধরন থেকে বেরিয়ে এসেছে আরও বেশ কিছু উপধরন। তার মধ্যে বেশি সংক্রমণশীল ছিল বিএ.২.৮৬ এবং ইজি.৫। ইজি.৫ শনাক্ত হয়েছিল ২০২৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এবং এর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ প্রায় ৩৮টি দেশে। মারাও গিয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। ভারত ও বাংলাদেশেও এই উপধরন শনাক্ত হয়েছিল। বিএ.২.৮৬ অনেক শক্তিশালী একটি উপধরন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, কিন্তু মাত্র তিন মাসের মধ্যে বিএ.২.৮৬-কে সরিয়ে জেএন.১ তার পূর্বসূরিদের চেয়ে অধিকতর সংক্রমণশীল হয়ে উঠেছে।

 

জেএন.১ :

 

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়তে থাকা উপধরন জেএন.১। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বজুড়েই নতুন করে চোখ রাঙাচ্ছে করোনার এই সাম্প্রতিকতম রূপ। সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন ও জাপানে এর সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসাব অনুযায়ী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেএন.১ শনাক্ত হয়েছে ৪৮টি দেশে। আগামী দিনে তা আরও বাড়বে। আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঘটছে করোনার এই নতুন উপধরনের কারণে মৃত্যুও।

 

এই উপধরনে আক্রান্ত হয়ে এযাবৎ ভারতে সাতজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং সেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। শুধু গত দুই সপ্তাহেই (২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত) বিশ্বব্যাপী অমিক্রন থেকে উদ্ভূত নতুন উপধরনগুলোর কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৬৫৪ জনের। বাংলাদেশেও গত ২৩ দিনে (২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত) করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন ৮৩ জন। তবে করোনায় আক্রান্ত ওই সব ব্যক্তির মধ্যে কতজন জেএন.১ দ্বারা সংক্রমিত, তা সম্ভবত খতিয়ে দেখা হয়নি। গত তিন বছরে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণে মারা গিয়েছেন ২৯ হাজার ৪৭৭ জন।

 

এখন সংক্রমণশীল হয়ে উঠেছে জেএন.১। তার মূলে রয়েছে এটির স্পাইক প্রোটিনে ঘটে যাওয়া বিশেষ এক মিউটেশন (এলফোর৫৫এস)।

 

এই মিউটেশন তার পূর্বসূরি বিএ.২.৮৬ ধরনের মধ্যে দেখা যায়নি। দেহের প্রতিরোধব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া এই অভিনব মিউটেশন প্রচলিত টিকা ও অ্যান্টিবডিগুলোও এড়িয়ে যেতে সক্ষম। এর পাশাপাশি বিএ.২.৮৬ ধরনের মতো জেএন.১ উপধরনে স্পাইক প্রোটিনে ৩০টির বেশি অনন্য মিউটেশন রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এস: ৪৮৬পি, এস: ৪৫৬এল। এ ছাড়া জাতটিতে নন-স্পাইক উপাদানের আরও কয়েকটি মিউটেশন রয়েছে। এসব মিউটেশন তাদের বংশবৃদ্ধির সুবিধাও দিয়ে থাকে। জেএন.১ যে অতি দ্রুত হারে ছড়াচ্ছে, এর মূলে রয়েছে অধিক হারে মিউটেশন।

 

আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই

 

নতুন ভ্যারিয়েন্টের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই বিজ্ঞানীরা বলছেন এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নতুন ভ্যারিয়েন্ট জেএন১ কে এখনও উদ্বেগজনক আখ্যা দেয় নি, তারা নজর রাখছে এই ভ্যারিয়েন্টটির দিকে।

 

কোভিড মহামারীর পুরো সময়টা জুড়েই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক ছিলেন যিনি, সেই ড. সৌমিয়্যা স্বামীনাথন সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, “আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কিন্তু আতঙ্কের কিছু নেই। আমাদের কাছে এখনও এই তথ্য নেই যে নতুন জেএন১ ভ্যারিয়েন্টটি কতটা গুরুতর অভিঘাত হানতে পারে অথবা এটি অনেক বেশি নিউমোনিয়া বা মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে কী না।

 

“সাধারণ কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলেই চলবে। এইসব ব্যবস্থাগুলো সঙ্গে তো আমরা ইতিমধ্যেই পরিচিত হয়ে গেছি। অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের সঙ্গে আমরা পরিচিত, এটিও সেই ধরনেরই ভ্যারিয়েন্ট,” জানিয়েছেন ড. স্বামীনাথন।

 

কলকাতার চিকিৎসক ডা. সায়ন চক্রবর্তী বলছেন, “গত কয়েক বছরে আমরা সবাই জানি কোভিডের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে গেলে কী কী করতে হবে। মাস্ক পড়া বা বেশি ভিড়ের মধ্যে যাওয়া এড়িয়ে চলা ইত্যাদি। মাস্ক পড়লে শুধু কোভিড নয়, যে ধরণের সাধারণ সর্দি, জ্বর, কাশি ইত্যাদি হচ্ছে, সেসবের থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। তাই মাস্ক পড়লে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকা যাবে।“

 

ভারতের কয়েকটি রাজ্য ইতিমধ্যেই মাস্ক পড়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক করা হয় নি কোথাও।

 

আবার ড. স্বামীনাথন বলছেন, “মাস্ক পড়া এখনই বাধ্যতামূলক করার দরকার নেই। বয়স্ক মানুষ, সন্তান সম্ভবা নারী এবং অন্য যারা জটিল রোগে ভুগছেন, তারা মাস্ক পড়লেই আপাতত চলবে।“

অর্থআদালতডটকম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবহার হতে বিরত থাকুন।

নতুন রূপে এসেছে করোনা,জেএন.১

আপডেটঃ ১২:১৬:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩

 

শীতে ফ্লু ভাইরাস, রাইনোভাইরাস এবং শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসের মতো অন্যান্য মৌসুমি ভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যায়। তাদের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে কোভিড-১৯ সৃষ্টিকারী সার্স-কোভ-২ করোনাভাইরাসের আরও একটি পরিবর্তিত উপধরন জেএন.১।

 

আমরা দেখেছি, করোনার অমিক্রন ধরনের বিভিন্ন উপধরন যেমন এইচভি.১, বিএ ২.৮৬ গত বছর ২০২২ এবং চলতি বছরও দাপট দেখিয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রাণবিয়োগও ঘটেছে করোনায় আক্রান্ত লক্ষাধিক মানুষের।

 

এর মধ্যে প্রাণঘাতী ভাইরাস সার্স-কোভ-২–এর এই অতিসংক্রামক জেএন.১ উপধরন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) সতর্ক করে বলেছে, এবারের শীতে জেএন.১-এর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে, যার প্রমাণ ইতিমধ্যেই মিলেছে।

 

এই উপধরন যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বর মাসে ধরা পড়েছিল, যখন এর সংক্রমণের হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এর সংক্রমণ ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এসে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৩ শতাংশে। কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে (২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত) এই সংক্রমণের হার এসে দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশে।

 

সংক্রমণে ডিসেম্বরে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ, যা প্রমাণ করে যে এই উপধরন নিঃসন্দেহে আরও বেশি সংক্রমণশীল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এটিকে কড়া নজরে রেখেছে এবং করোনার এই উপধরনকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা ‘আগ্রহের বৈকল্পিক’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে।

 

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ধরন জেএন.১-এর লক্ষণ আগের ধরনগুলোর মতোই। যেমন জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, স্বাদ বা গন্ধ হারানো, ক্লান্তি ইত্যাদি। এ ছাড়া গুরুতর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, ডায়রিয়া এবং বিভ্রান্ত বোধ করা।

 

সার্স-কোভ-২ ভাইরাস তার আরএনএ-জিনোমের তথ্য অনুযায়ী মোট ৩০ থেকে ৩২টি প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম। যার মধ্যে ‘স্পাইক’ হলো সবচেয়ে আলোচিত একটি প্রোটিন। এটি করোনাভাইরাসের মূল সংক্রামক উপাদান বা অ্যান্টিজেন। প্রতিটি ভাইরাসের গায়ে কাঁটার মতো স্পাইক প্রোটিন থাকে। এরাই মানবশরীরে প্রবেশ করে কোষকে আক্রান্ত করে এবং নানা উপসর্গ সৃষ্টি করে। এসব স্পাইকের মিউটেশন বা চরিত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন কোনো ধরন বা উপধরনের সৃষ্টি হয়। অমিক্রনের একটি উপধরন হলো জেএন.১।

 

রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে ফাঁকি দেওয়ায় জেএন.১ অনেক বেশি কার্যকর। ফলে এর সংক্রমণের হার বেশি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে স্পাইক প্রোটিনকে ভিত্তি করেই প্রচলিত সব প্রতিষেধক তৈরি করা হয়েছে। তবে করোনাভাইরাস খুব চালাক প্রকৃতির জীবাণু। প্রতিরোধী ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য তাদের বড় একটি হাতিয়ার হলো, স্পাইক প্রোটিনের কাঠামোগত পরিবর্তন করা এবং এ কাজ তারা অনায়াসে করে মিউটেশনের মাধ্যমে।

 

প্রাথমিকভাবে অমিক্রন ধরনের প্রধান উপধরন হিসেবে আমরা দেখেছি বিএ.১ থেকে বিএ.৫ পর্যন্ত পাঁচটি রূপ। যার মধ্যে বিএ.২ ছিল বেশ দাপুটে ও ধ্বংসাত্মক। বিএ.২ বা ‘স্টিলথ ধরন’ নামে পরিচিত অমিক্রনের ওই উপধরনের ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ বেশ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। সঙ্গে ভিন্নতর মিউটেশনের ধারায় আরও একটি শাখার উত্থান ঘটেছিল, যা এক্সবিবি নামে অভিহিত। ২০২২ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এদের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ সংক্রমিত হন। মৃত্যু হয় প্রায় আড়াই লাখ মানুষের।

 

সময়ের সঙ্গে বিএ.২ ও এক্সবিবি ধরন থেকে বেরিয়ে এসেছে আরও বেশ কিছু উপধরন। তার মধ্যে বেশি সংক্রমণশীল ছিল বিএ.২.৮৬ এবং ইজি.৫। ইজি.৫ শনাক্ত হয়েছিল ২০২৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এবং এর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ প্রায় ৩৮টি দেশে। মারাও গিয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। ভারত ও বাংলাদেশেও এই উপধরন শনাক্ত হয়েছিল। বিএ.২.৮৬ অনেক শক্তিশালী একটি উপধরন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, কিন্তু মাত্র তিন মাসের মধ্যে বিএ.২.৮৬-কে সরিয়ে জেএন.১ তার পূর্বসূরিদের চেয়ে অধিকতর সংক্রমণশীল হয়ে উঠেছে।

 

জেএন.১ :

 

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়তে থাকা উপধরন জেএন.১। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বজুড়েই নতুন করে চোখ রাঙাচ্ছে করোনার এই সাম্প্রতিকতম রূপ। সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন ও জাপানে এর সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসাব অনুযায়ী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেএন.১ শনাক্ত হয়েছে ৪৮টি দেশে। আগামী দিনে তা আরও বাড়বে। আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঘটছে করোনার এই নতুন উপধরনের কারণে মৃত্যুও।

 

এই উপধরনে আক্রান্ত হয়ে এযাবৎ ভারতে সাতজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং সেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। শুধু গত দুই সপ্তাহেই (২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত) বিশ্বব্যাপী অমিক্রন থেকে উদ্ভূত নতুন উপধরনগুলোর কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৬৫৪ জনের। বাংলাদেশেও গত ২৩ দিনে (২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত) করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন ৮৩ জন। তবে করোনায় আক্রান্ত ওই সব ব্যক্তির মধ্যে কতজন জেএন.১ দ্বারা সংক্রমিত, তা সম্ভবত খতিয়ে দেখা হয়নি। গত তিন বছরে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণে মারা গিয়েছেন ২৯ হাজার ৪৭৭ জন।

 

এখন সংক্রমণশীল হয়ে উঠেছে জেএন.১। তার মূলে রয়েছে এটির স্পাইক প্রোটিনে ঘটে যাওয়া বিশেষ এক মিউটেশন (এলফোর৫৫এস)।

 

এই মিউটেশন তার পূর্বসূরি বিএ.২.৮৬ ধরনের মধ্যে দেখা যায়নি। দেহের প্রতিরোধব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া এই অভিনব মিউটেশন প্রচলিত টিকা ও অ্যান্টিবডিগুলোও এড়িয়ে যেতে সক্ষম। এর পাশাপাশি বিএ.২.৮৬ ধরনের মতো জেএন.১ উপধরনে স্পাইক প্রোটিনে ৩০টির বেশি অনন্য মিউটেশন রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এস: ৪৮৬পি, এস: ৪৫৬এল। এ ছাড়া জাতটিতে নন-স্পাইক উপাদানের আরও কয়েকটি মিউটেশন রয়েছে। এসব মিউটেশন তাদের বংশবৃদ্ধির সুবিধাও দিয়ে থাকে। জেএন.১ যে অতি দ্রুত হারে ছড়াচ্ছে, এর মূলে রয়েছে অধিক হারে মিউটেশন।

 

আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই

 

নতুন ভ্যারিয়েন্টের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই বিজ্ঞানীরা বলছেন এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নতুন ভ্যারিয়েন্ট জেএন১ কে এখনও উদ্বেগজনক আখ্যা দেয় নি, তারা নজর রাখছে এই ভ্যারিয়েন্টটির দিকে।

 

কোভিড মহামারীর পুরো সময়টা জুড়েই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক ছিলেন যিনি, সেই ড. সৌমিয়্যা স্বামীনাথন সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, “আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কিন্তু আতঙ্কের কিছু নেই। আমাদের কাছে এখনও এই তথ্য নেই যে নতুন জেএন১ ভ্যারিয়েন্টটি কতটা গুরুতর অভিঘাত হানতে পারে অথবা এটি অনেক বেশি নিউমোনিয়া বা মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে কী না।

 

“সাধারণ কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলেই চলবে। এইসব ব্যবস্থাগুলো সঙ্গে তো আমরা ইতিমধ্যেই পরিচিত হয়ে গেছি। অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের সঙ্গে আমরা পরিচিত, এটিও সেই ধরনেরই ভ্যারিয়েন্ট,” জানিয়েছেন ড. স্বামীনাথন।

 

কলকাতার চিকিৎসক ডা. সায়ন চক্রবর্তী বলছেন, “গত কয়েক বছরে আমরা সবাই জানি কোভিডের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে গেলে কী কী করতে হবে। মাস্ক পড়া বা বেশি ভিড়ের মধ্যে যাওয়া এড়িয়ে চলা ইত্যাদি। মাস্ক পড়লে শুধু কোভিড নয়, যে ধরণের সাধারণ সর্দি, জ্বর, কাশি ইত্যাদি হচ্ছে, সেসবের থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। তাই মাস্ক পড়লে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকা যাবে।“

 

ভারতের কয়েকটি রাজ্য ইতিমধ্যেই মাস্ক পড়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক করা হয় নি কোথাও।

 

আবার ড. স্বামীনাথন বলছেন, “মাস্ক পড়া এখনই বাধ্যতামূলক করার দরকার নেই। বয়স্ক মানুষ, সন্তান সম্ভবা নারী এবং অন্য যারা জটিল রোগে ভুগছেন, তারা মাস্ক পড়লেই আপাতত চলবে।“