ঢাকায় ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ বায়ুদূষণ
- আপডেটঃ ১১:৫১:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৪
- / ৯১৭ বার পঠিত
ঢাকায় ২০২৩ সাল ছিল আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর বছর। ২২ ডিসেম্বর বায়ুদূষণে বিশ্বের ১০০ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম। আর আইকিউএয়ারের বাতাসের মানসূচকে (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স-একিউআই) ঢাকার স্কোর ছিল ৪৪০। এ স্কোরকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বলে গণ্য করা হয়।
ক্যাপস জানায়, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ২২০। ২০১৭ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২০৪। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দূষণ একটু বেড়ে হয় ২১১। ২০১৯ সালে আবার কমে গিয়ে হয় ২০৫। ২০২০ সালে অনেকটা বেড়ে হয় ২৩২। ২০২১ সালে আবার কমে হয় ২০৭। ২০২২ সালে বেড়ে ২৪৯ এবং ২০২৩ সালে তা এসে দাঁড়ায় ২২৮-এ। এ হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার দূষণের মাত্রা কম।
আবার সবচেয়ে কম বায়ুদূষণ সূচক ছিল ২০১৭ এবং ২০২০ সালে, যথাক্রমে ১৪৬ এবং ১৪৩।
ঢাকায় বায়ুর মান বেশি খারাপ থাকে শীতে। বর্ষায় মোটামুটি গ্রহণযোগ্য থাকে। ক্যাপসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আট বছরে ২০২২ সাল ছাড়া প্রতিবছরই জানুয়ারি মাসে বায়ুর মান বেশি খারাপ ছিল। কম খারাপ ছিল জুলাই ও আগস্টে। এই দুই মাসে বৃষ্টি হয়।ফলে দেখা যাচ্ছে, বৃষ্টি হলে ঢাকার মানুষ মোটামুটি নির্মল বায়ুতে শ্বাস নিতে পারে। বৃষ্টি চলে যাওয়ার পর অক্টোবর মাস থেকে দূষণ বাড়তে থাকে।
আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো শহরের নম্বর ৫০ বা তার কম হলে বায়ুর মান ভালো বলে ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ হলে তাকে ‘মাঝারি’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’, ১০১ থেকে ১৫০ নম্বরকে ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ ও ১৫১ থেকে ২০০ হলে ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০ হলে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বায়ুর শহর হিসেবে ধরা হয়। নম্বর ৩০১-এর বেশি হলে বায়ুর মানকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ধরা হয়।
এর আগে সোমবার সকাল ৯টা ২১ মিনিটে ঢাকায় বাতাসের মান ছিল ২৫৩। তখনও ঢাকা ছিল শীর্ষ অবস্থানে। বায়ুর মানমাত্রা বিচারে এ মাত্রাকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঢাকায় বায়ুদূষণের জন্য মূলত ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া ও নির্মাণ সাইটের ধুলোকে দায়ী করা হয়। এই দূষণের ফলে অনেক বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এই দূষণ সব বয়সী মানুষের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি, প্রবীণ ও অন্তঃসত্তবাদের জন্য বায়ুদূষণ খুবই ক্ষতিকর।
ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি কেমন, তা বুঝতে সাদা রঙের কাপড় দিয়ে বানানো একটি কৃত্রিম ‘ফুসফুস’ রাস্তার পাশে দুই দফা রেখে দিয়েছিল শক্তি ফাউন্ডেশন নামের একটি বেসরকারি সংস্থা। প্রথমবার গত অক্টোবরে, দ্বিতীয়বার ডিসেম্বরে। মিরপুরে সংস্থাটির কার্যালয়ের সামনে রাখা ওই সাদা কাপড়ের ফুসফুস প্রথম দফায় ২১ দিনে, দ্বিতীয় দফায় ১৪ দিনে ধূসর হয়ে যায়।
শক্তি ফাউন্ডেশন জানায়, ধুলাবালুর কারণে কাপড়টির রং কত দ্রুত বদলায়, তা দেখে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি বোঝা যায়। শুধু ঢাকায় নয়, ভারতের নয়াদিল্লি, বেঙ্গালুরু, লক্ষ্ণৌ, মুম্বাই ও লুধিয়ানা এবং নেপালের কাঠমান্ডুতে এর আগে এভাবে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা হয়েছে।
দূষণ কমছে না কেন, ঢাকার বায়ুদূষণ যে বাড়ছে, তা স্বীকার করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মোহাম্মাদ আব্দুল মোতালিব। তিনি বিবৃতে বলেন, ‘দূষণ যে বাড়ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দূষণের উৎসগুলোর মধ্যে আছে উপমহাদেশীয় দূষিত বায়ুপ্রবাহ, রান্নার ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের দূষণ। উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা হচ্ছে।’
বায়ুদূষণের প্রসঙ্গ এলে দূষণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা উপমহাদেশীয় দূষিত বায়ুপ্রবাহের বিষয়টি সামনে রাখেন। গত বছর মার্চে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের গবেষণা ‘নির্মল বায়ুর জন্য চেষ্টা: দক্ষিণ এশিয়ায় বায়ুদূষণ ও জনস্বাস্থ্য’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশের ওপর দিয়ে একই মেঘমালা উড়ে যায়। ওই মেঘের মধ্যে দূষিত বায়ু গিয়ে আশ্রয় নেয়, যা বাংলাদেশেও দূষিত বায়ু ছড়িয়ে দেয়।
অবশ্য গবেষকদের মত, ঢাকার বায়ুদূষণে এই বায়ুপ্রবাহের দায় গড়ে ৩০ শতাংশের বেশি নয়। বাকিটার জন্য দায়ী স্থানীয় উৎস। সেই উৎসগুলো বন্ধে নামকাওয়াস্তে কিছু অভিযান চলে। সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ কম।
যেমন ঢাকায় বায়ুদূষণের একটি বড় কারণ পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় বাসের কালো ধোঁয়া। রাজধানীতে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মেট্রোরেল অবকাঠামোর ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ-চালিত ট্রেন চলছে। তার নিচেই কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে চলছে পুরোনো বাস। ফলে দূষণ কমছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বায়ুদূষণ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও জরিমানার তথ্যগুলো থাকে। ওয়েবসাইট ঘেঁটে ঢাকায় গত মাস ডিসেম্বরে (১৮ ডিসেম্বর) যানবাহনের কালো ধোঁয়া দ্বারা বায়ু দূষণের বিরুদ্ধে শুধু একটি অভিযানের তথ্য পাওয়া যায়। ওই অভিযানে পুরান ঢাকার টিকাটুলীতে ৫টি যানবাহনকে ৮ হাজার ৫০ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণ রোধে সরকার ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুটি প্রকল্পে অন্তত সাড়ে ছয় কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে, যা বর্তমানে প্রায় ৭২০ কোটি টাকার সমান। নতুন করে বায়ু, পানিদূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার ‘বাংলাদেশে টেকসই পরিবেশ ও রূপান্তর’ শিরোনামে আরেকটি প্রকল্প নিয়েছে। এতে ২৫ কোটি ডলার (২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা) অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্লেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প নিলে অর্থ ব্যয় হবে। কিন্তু পুরোনো বাস উঠিয়ে নেওয়া, যানবাহনে কম দূষণকারী জ্বালানির ব্যবহার, দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ করা, নির্মাণসামগ্রীর সঠিক ব্যবস্থাপনা ও শহরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর না দিলে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকার বায়ুদূষণের স্থানীয় উৎস, যেমন যানবাহন ও কলকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। অনেক প্রকল্প হয়েছে, কিন্তু এর সুফল দেখা যাচ্ছে না।’
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় ৭৮ থেকে ৮৮ হাজার মানুষ মারা গেছে। রাজধানীতে বায়ুদূষণের কারণে কত মানুষ রোগাক্রান্ত হচ্ছে, তার হিসাব নেই।










