গণপরিবহনে অপেক্ষায় থাকে ‘ধর্ষককেরা’
- আপডেটঃ ০২:১৬:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৪
- / ১০০০ বার পঠিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন শাহারিয়া আফরিন বলেন, নারীকে অধীনস্ত ভাবা, নারীকে ‘চাইলেই পেতে পারি’ ধরনের পুরুষতান্ত্রিক-পেশিশক্তি প্রদর্শনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।
বছর কয়েক আগে এক অভিযুক্ত ধর্ষক পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দেন। বলেন, তুলনামূলক নীরব ঘটনাস্থলে তিনি প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর অবস্থান করতেন। কখন কোন মেয়ে একা এই পথ দিয়ে যাবে, সেই অপেক্ষায় থাকতেন তিনি।
গণপরিবহনে ধর্ষণের বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করে এমন আরও প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনে ধর্ষণের ঘটনা।
গত মঙ্গলবার ভুল ট্রেনে উঠে পড়ে এক কিশোরী। বিষয়টি বুঝতে পেরে ‘সুযোগের’ অপেক্ষায় ছিলেন ট্রেনের অ্যাটেনডেন্ট আক্কাস গাজী (৩২)। একটি কেবিন খালি হলে তিনি কিশোরীকে আসন থেকে সেখানে নিয়ে ধর্ষণ করেন। বাস, ট্রেন, লঞ্চ কোনো গণপরিবহনই নারীর নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে পারছে না। গণপরিবহনে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, যৌন হয়রানি-নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। এসব ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ‘সুযোগের’ অপেক্ষায় থাকছে কিংবা ‘সুযোগ’ তৈরি করে নিচ্ছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সংকলিত করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ২০১৯ ও ২০২১ সালে গণপরিবহনে নারী নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেছিল। সমিতির তথ্যমতে, ২০১৯ সালে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৫২টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১৬টি ধর্ষণ, ১২টি দলবদ্ধ ধর্ষণ, ৯টি ধর্ষণচেষ্টা ও ১৫টি যৌন হয়রানি। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে গণপরিবহনে ৬৮টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২৩টি ধর্ষণ, ১১টি দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ৩৪টি যৌন হয়রানি।
এক খবর অনুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বাসে একটি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। সে বছরের ১৯ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় চলন্ত বাসে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়ছিল। ঘটনার দিন কয়েক পর ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে এক প্রতিবেদকের কথা হয়েছিল। তখন এই নারী বলেছিলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জের গাউছিয়ায় যাওয়ার জন্য ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে রাত ১০টার দিকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবহন নামে একটি বাসে ওঠেন। বাসটি চিটাগাং রোডে আসার পর সব যাত্রী নেমে গেলে তিনি একা হয়ে যান।
এ সময় বাসচালক, তাঁর সহকারীসহ তিনজন উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে তাঁকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করেন। তিনি ৯৯৯ নম্বরে কল দিলে পুলিশ এসে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তিনি সে সময় বলেছিলেন, তাঁর স্বামী তখনো তাঁকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত স্বামী তাঁর পাশে থাকবেন কি না, তা নিয়ে তাঁর মধ্যে আশঙ্কা কাজ করছে। সর্বশেষ অবস্থা জানতে সম্প্রতি এই নারীর মুঠোফোনে কল করেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
২০২২ সালের ৭ অক্টোবর কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা তুরাগ কমিউনিটি ট্রেনের একটি বগিতে নিয়ে এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বশেষ গত সপ্তাহে চলন্ত ট্রেনে কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা ঘটল।
গণপরিবহনে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেই ভারতের ‘নির্ভয়া’ ও বাংলাদেশের রূপা খাতুনের কথা সামনে আসে।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর নির্ভয়াকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট চলন্ত বাসে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন সিরাজগঞ্জের মেয়ে রূপা। মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে বিচারের অপেক্ষায়। মাত্র ১৪ কার্যদিবসের পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এই মামলার চার আসামির ফাঁসির আদেশ দেন। একজনকে দেওয়া হয় সাত বছরের কারাদণ্ড। তবে গত পাঁচ বছরেও উচ্চ আদালতে মামলার শুনানি হয়নি বলে জানান রূপার বড় ভাই। নিম্ন আদালতের রায়ে বাসটি রূপার পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ ছিল।
২০১৯ সালের ৬ মে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে স্বর্ণলতা পরিবহনে নার্স শাহিনুর আক্তারকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়।
গত বছরের ১৮ জুন ময়মনসিংহের ভালুকায় এক নারী পোশাকশ্রমিককে চলন্ত বাসে ধর্ষণের চেষ্টা করেন চালক ও তাঁর সহকারীরা। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে তাঁরা চলন্ত বাস থেকে এই নারীকে সড়কে ফেলে দেন। দুই দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান।
২০২২ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরে চলন্ত বাস থেকে স্বামীকে ফেলে দিয়ে এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। একই বছরের ২ আগস্ট দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল পরিবহনের চলন্ত বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। টাঙ্গাইলের মধুপুরে বাসটিকে ফেলে যায় ডাকাতেরা। বাসটিতে ধর্ষণের শিকার নারী গত শুক্রবার এই প্রতিবেদককে বলেন, তিনি ধর্ষকদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চান, যাতে আর কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সড়ক, মহাসড়ক ও গণপরিবহনে ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। চালক, সহকারী, সুপারভাইজারের নিয়োগপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি নিয়ে তথ্যভান্ডার তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এ ধরনের অপরাধ কমাতে গণপরিবহনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের চেয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। তিনি গতকাল বলেন, দূরপাল্লার চেয়ে শহরে চলাচল করা বাসে নারী নির্যাতন-হয়রানির ঘটনা বেশি ঘটে। সরকারিভাবে নজরদারির ব্যবস্থা না থাকলে বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেও লাভ হবে না।
২০২২ সালের জুলাইয়ে এক কলেজছাত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, তিনি বিকাশ পরিবহনের একটি বাসে করে ধানমন্ডি থেকে আজিমপুরে যাচ্ছিলেন। কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছিলেন। তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। সব যাত্রী নেমে যাওয়ার পর তিনি বাসটিতে একা ছিলেন। তখন বাসের চালকের সহকারী তাঁর সঙ্গে অশালীন আচরণ শুরু করেন। তিনি বাস থামানোর জন্য চিৎকার করেন। কিন্তু চালক বাস চালিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে আজিমপুরে বাসের গতি কমাতে বাধ্য হন চালক। তখন তিনি বাস থেকে লাফিয়ে নেমে পড়েন।
এ ঘটনায় হওয়া মামলাটি দেখভাল করছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার কুদরত-ই-খুদা। তিনি এখন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার। ঘটনাটির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভিডিও ফুটেজ থেকে বাসটি শনাক্ত করে চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ঘটনার পর তিনটি বাসে চালকদের ইউনিফর্ম পরা ও ক্যামেরা বসানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গণপরিবহনের সামনে-পেছনে ক্যামেরা স্থাপন, চালকের নাম, পরিবহনের নাম, কোড নম্বরসহ নির্দিষ্ট ইউনিফর্মের ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
২০২১ সালের নভেম্বরে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ‘চ্যালেঞ্জিং ফিয়ার অব ভায়োলেন্স’ (সহিংসতার ভয়ের চ্যালেঞ্জ) শিরোনামের এক জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের পথঘাটে, গণপরিবহনে, বাসস্টপ, ট্রেন স্টেশনসহ জনসমাগমস্থলে কিশোরী-তরুণীদের হয়রানি-নিপীড়নের ৮২ শতাংশ ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় মামলা হচ্ছে ৩ শতাংশের কম।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), ইয়াং বাংলা ও সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) এক যৌথ অনলাইন জরিপে বলা হয়, গণপরিবহনে ৩৬ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।নারীর যাতায়াত নিরাপদ করার উদ্দেশ্যে রাজধানীর ১০০টি বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর একটি পাইলট প্রকল্প নেয় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ‘গণপরিবহনে নারীর নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন কর্মসূচি’ নামের দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে বেসরকারি সংগঠন দীপ্ত ফাউন্ডেশন। গত বছরের আগস্টে প্রকল্পটি শেষ হয়। তবে প্রকল্প চলাকালে দেখা যায়, ১০০টি বাসে স্থাপন করা ক্যামেরার মধ্যে সব সময় ২০-২৫টিতে ত্রুটি বা ক্যামেরা বন্ধ থাকছে।
প্রকল্পটির সর্বশেষ পরিচালক বলেন, ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে প্রকল্পে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দেখা গেছে, ক্যামেরা থাকলে বেশিসংখ্যক নারী বাসে চড়তে আস্থা পান। নিপীড়নের ঘটনাও ঘটে না। দুই বছরে নিপীড়নের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নজরদারির দুর্বলতা ও অনেক বাসের ক্যামেরার ত্রুটি প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব দীপক কুমার রায় বলেন, প্রযুক্তিগতভাবে নজরদারি রাখা গেছে। তবে মাঠে বাসগুলো পর্যবেক্ষণে রাখার মতো জনবল ছিল না। ৭০ থেকে ৮০টি বাসে ক্যামেরা সব সময় চালু থাকত। বাসের সার্ভিসিং বা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অনেক সময় কিছু ক্যামেরা বন্ধ থাকত। প্রকল্পটি আরও বড় পরিসরে আসবে বলে জানান তিনি।










