বেশির ভাগ থানা লন্ডভন্ড, নেই পুলিশ
- আপডেটঃ ০৪:৩১:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অগাস্ট ২০২৪
- / ৯১১ বার পঠিত
বাতাসে পোড়া গন্ধ, সড়কে কালো ছাইয়ের আস্তরণ। বিভিন্ন স্থানে পড়ে আছে পুলিশের ক্যাপ, জামা, জুতো।থানা ভবনের সামনে আগুনে পোড়া গাড়ির সারি। ভেতরে ঢোকার কলাপসিবল গেট ভাঙা। ভবনে ঢুকে চোখে পড়ল ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। নথিপত্র মেঝেতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে। থানা থেকে লুটপাট করা হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্রসহ নানা জিনিসপত্র। থানায় নেই কোনো পুলিশ সদস্য।
গতকাল মঙ্গলবার (০৬ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন থানায় গিয়ে এই চিত্র দেখা গেল। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানায় গিয়ে দেখা গেল, ভবনের সামনে তিনজনের মরদেহ পড়ে আছে। এর মধ্যে দুজনের মরদেহে পুলিশের পোশাক। আরেকটি মরদেহের হাতে হাতকড়া পরানো।
শুধু যাত্রাবাড়ী নয়, রাজধানীর ৫০ থানার প্রায় অর্ধেকেই সোমবার হামলা চালানো হয়। ভাঙচুরের পাশাপাশি অনেক থানায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, চলে লুটপাট। পুলিশ গুলি চালালে হামলাকারীদের অনেকে হতাহত হন। সেই সঙ্গে হামলা-পিটুনি ও আগুনে পুড়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও মারা যান। এদিকে আতঙ্কে আগেই থানা থেকে সরে যান অনেকে। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর ঘটতে থাকে এসব ঘটনা। এতে রাজধানীর বেশির ভাগ থানা কার্যত পুলিশশূন্য হয়ে পড়েছে। সড়কে কোথাও দেখা যায়নি ট্রাফিক পুলিশ। সারাদেশে ৪৫০টির বেশি থানায় হামলা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ সূত্র। পুলিশের অধস্তন কর্মচারীরা কর্মবিরতির কথা জানালেও সে ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কিছু জানা যায়নি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাউকেই প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার কে এন রায় নিয়তি বলেন, সব থানার সার্বিক তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। তবে ঢাকার বেশির ভাগ থানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সব কিছু। এমন পরিস্থিতিতে থানাগুলোয় কোনো কার্যক্রম চলছে না।
যাত্রাবাড়ী থানায় গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা মূল ভবনটি থেকে গতকাল দুপুরেও ধোঁয়া উড়ছিল। সোমবার সেখানে হামলা চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলে হামলা-পাল্টা হামলা। পুলিশ গুলি চালিয়ে বিপুল সংখ্যক হামলাকারীর হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা চালায়। এতে অনেকে হতাহত হন। সোমবার রাত ও গতকাল সকালে সেখান থেকে অন্তত ১৫ জনের মৃতদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। এর মধ্যে গতকাল থানার সামনে থেকে তিনজন ও থানা ভবনের ভেতর থেকে দু’জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় তরুণ-যুবকরাই লাশগুলো উদ্ধার করে ট্রাকে তুলে নিয়ে যান। কেউ কেউ আবার থানা ভবনে ঢুকে যা পাচ্ছেন, তাই নিয়ে বের হয়ে আসছিলেন। থানা চত্বর ও সামনের সড়কে প্রায় ২০টি যানবাহন আগুনে পোড়ানো হয়েছে।
বংশাল থানাতেও সোমবার বিকেলে হামলা চালানো হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের দোতলায় যাওয়ার সিঁড়িতে বিছানা ও টেবিলের কাঠামোসহ নানা সরঞ্জাম পড়ে রয়েছে। থানার সাইনবোর্ড, জানালা-দরজাসহ সবই ইটপাটকেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। থানার সামনের সড়কে পড়ে আছে অনেকগুলো মামলার এজাহার।
প্রত্যক্ষদর্শী কিশোর সালমান মেহেদী জুবায়ের জানায়, সোমবার বিকেল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত চলে হামলা এবং জবাবে পুলিশ গুলি চালায়। শুরুতে হামলাকারীরা থানায় ঢুকে পুলিশকে জিম্মি করে বিভিন্ন জিনিসপত্র লুট করে। পরে পুলিশের ওপর হামলা চালাতে গেলে তারা থেমে থেমে গুলি ছোড়ে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল তাদের উদ্ধার করতে আসে। তবে বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে তারা কিছুই করতে পারেনি। পরে গভীর রাতে পুলিশ সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে ছুড়তে থানা থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় গুলিতে পাঁচজন নিহত হন।
যাত্রাবাড়ী ও বংশাল ছাড়াও রাজধানীর বাড্ডা, ভাটারা, খিলগাঁও, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, শাহআলী, পল্টন, উত্তরা পূর্ব ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ বেশ কিছু থানায় হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানায় ব্যাপক ভাঙচুর করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গতকাল সকালেও সেখান থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। থানা চত্বরে পড়ে ছিল পুড়ে যাওয়া বেশ কিছু গাড়ি ও আসবাব। এর আগে রাতেই থানার ভেতর থেকে ফ্যান, চেয়ার, টেবিল, ফ্রিজসহ নানা ধরনের সামগ্রী লুট হয়ে যায়। সেই সঙ্গে থানার সব অস্ত্র-গুলি লুট হয়েছে বলেও একটি সূত্রে জানা যায়। মোহাম্মদপুর থানার অদূরে আদাবর থানাতেও হামলা চালিয়ে লুটপাট করা হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যানবাহন। সব ক্ষেত্রেই থানায় থাকা মামলার নথিপত্র ও আলামত নষ্ট হয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তিন বাহিনীর সঙ্গে পুলিশ-বিজিবি:
চলমান পরিস্থিতিতে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সঙ্গে বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও আনসার সহায়তা করছে। গতকাল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ (আইএসপিআর) পরিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ব্যাপারে জানানো হয়। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সবার সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
এদিকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী উপমহাপরিচালক ফখরুল আলম বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ঢাকা মহানগরসহ দেশের থানাগুলোর নিরাপত্তায় আনসার মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়াও ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আনসার গার্ড ব্যাটালিয়নকে (এজিবি)। তিনি জানান, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কাজ শুরু করেছে এজিবি।
এ ছাড়া ডিএমপির ৫০ থানা ও সাতটি ফাঁড়িতে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছে। ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ৩৭টি পয়েন্টে আনসার মোতায়েন করা হয়েছে। চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি রোধেও কাজ করবে তারা।










