ঢাকা , বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় শিশু অধিকার বিষয়ক এনজিওদের প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
  • আপডেটঃ ০৩:১৪:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ মার্চ ২০২৫
  • / ৮৭৯ বার পঠিত

আমরা, শিশু সুরক্ষা ও শিশু অধিকার নিয়ে কর্মরত জাতীয় ও আন্তজাতিক বেসরকারি সংস্থাসমূহ আজ একসাথে হয়েছি আপনাদের সাথে আমাদের গভীর উদ্বেগ ভাগাভাগি করে নিতে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক যৌন সহিংসতা, নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা বা হত্যা চেষ্টা আমাদের ভীষনভাবে দুঃখ ভারাক্রান্ত ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই সংকট শুধু শিশুদের জীবনকেই ধ্বংস করছে না, বরং আমাদের সমাজের মূল ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। বাংলাদেশে মেয়েশিশুদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা এই সহিংসতা জাতিকে হতবাক করেছে এবং সারাদেশে প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। দেশব্যাপী প্রতিবাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে আজ আমরাও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

 

আজ রোববার (১৬ মার্চ) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাসমূহ সংবাদ সম্মেলন করেন।

 

এ পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের গভীর উদ্বেগের পাশাপাশি, আমরা সরকারের কাছে কিছু দাবি উপস্থাপন করতে চাই, যা আমরা আশা করি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হবে এবং সরকার অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

 

বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য সরকারের কাছে একাধিকবার দাবী জানানো হয়েছে। অপরাধীরা প্রায়শই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়েযেতে সক্ষম হওয়ায় তারা পুনর্বার নির্যাতনে লিপ্ত হতে থাকে। এর সবচেয়ে মর্মান্তিক উদাহরণ হলো ২০১৬ সালে ৫ বছর বয়সী একটি শিশুকে নির্মমভাবে ধর্ষণের দায়ে কয়েক বছর আগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন অপরাধীর সাম্প্রতিক জামিন।

 

মাগুরায় ৮ বছর বয়সী শিশুর সাম্প্রতিক নির্মম ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ করে যে, জনপরিসরে, নিকট আত্মীয় এমনকি নিজের বাড়িতেও নিরাপদ নয় শিশুরা। যদিও অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়েছে, তবে আমরা আশু ও যথাযথ তদন্ত, বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবী জানাই।

 

পরিবারের সদস্য এবং নিকট আত্মীয়দের দ্বারা যৌন অসদাচরণের বিষয়ে নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। এই অপরাধীরা নীরবতার একটি সংস্কৃতিতে লালিত হচ্ছে যেখানে নিকট আত্মীয়দের দ্বারা সংঘটিত এমন কর্মকাণ্ড প্রকাশ করা একটি কলঙ্ক বা অসম্মান হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এটি মেয়েশিশুদের পাশাপাশি ছেলেশিশুদের জন্যও একটি বাস্তবতা। যারা অপরাধী তাদের দোষারোপ না করে উল্টো অপরাধের শিকার ব্যক্তিকেই অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়। শিশুদের সুরক্ষা ও সুষ্ঠু বিকাশের মতো এরকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সরকারের কাছে যথাযথ ও প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার পাচ্ছেনা বলেই মনে হচ্ছে।

 

এদিকে, শিশুরা যৌন নির্যাতন, বিপজ্জনক শ্রম, অবহেলা, অনলাইন সহিংসতা এবং অন্যান্য সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। শিশুরা তাদের বাড়িতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, জনসমক্ষে, কোথাও নিরাপদ নয়। শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি কার্যকর বা জবাবদিহিমূলক নয়।

 

শিশু অধিকার বাস্তবায়নে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় যুক্ত থাকলেও শিশুর কল্যাণের বিষয়টি মূলত- মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ তিনটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত। মন্ত্রণালয়গুলো তাদের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মতো শিশুদের জন্য কোনো আলাদা অধিদপ্তর নেই যা শিশুদের সাথে সম্পর্কিত সমস্ত বিষয়ে সমন্বয়কারী সংস্থা হিসাবে কাজ করতে পারে।

 

এধরনের পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মহিলা বিষয়ক সংস্কার কমিশনের মতো ‘শিশু বিষয়ক সংস্কার কমিশন’ প্রতিষ্ঠারও যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস।

 

আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই যে, তারা যেন শিশুদের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করেন। তাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সহায়তা ও সমর্থন প্রয়োজন। আমরা চাই সরকার অনতিবিলম্বে শিশুদের সমস্যাগুলিকে অগ্রাধিকার দিক, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের। বর্তমান পরিস্থিতি জরুরিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি করে, তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ আমাদের সবার উপলব্ধি করা অত্যাবশ্যক যে শিশুর প্রতি যে কোনো নির্যাতন ও সহিংসতা তার মনে এতটাই গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রভাব ফেলে যে তার স্বাভাবিক বিকাশ ও মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, সামাজিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় এবং সুন্দর ভবিষ্যত বিনির্মাণের পথ রুদ্ধ হয়।

 

বর্তমান সংকট মোকাবিলার জন্য কিছু দাবি উপস্থাপন করা হলো। আমরা আশা করি এগুলো পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জরুরিভাবে বিবেচনা করা হবে।

 

আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ সংস্থাসমূহর দাবি:

 

আইনের সংস্কার ও দ্রুত বিচার: শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলাগুলির দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হোক। অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যেন তারা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই আইন উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতির জন্য যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে ধর্ষণের মামলায় তদন্তের সময় ৩০ থেকে কমিয়ে ১৫ দিন করা হচ্ছে। আর বিচার শেষ করতে হবে ৯০ দিনের মধ্যে। সাম্প্রতিক সহিংসতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও বিচার বিষয়ে আইন উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হোক।

 

শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা: শিশুদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মতো একটি শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর স্থাপন করা হোক, যা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করবে।

 

শিশু সংস্কার কমিশন গঠন: শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ক একটি সংস্কার কমিশন জরুরী ভিত্তিতে গঠন করা হোক, যা সকল অংশীজনের সাথে পরামর্শের মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় একটি সুপারিশমালা প্রস্তুত করবে এবং অন্যান্য সংস্কার কমিশনের মতো তা প্রধান উপদেষ্টাকে হস্তান্তর করবে।

 

পারিবারিক সুরক্ষা নিশ্চিত: পরিবারে সদস্য ও নিকট আত্মীয়দের দ্বারা যৌন নির্যাতনের বিষয়ে নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙতে ব্যাপক জনসচেতনতামুলক কর্মসূচিগ্রহণ করা হোক, যেন ভুক্তভোগীরা নিরাপদে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারে।

 

শিশু সুরক্ষা আইন প্রয়োগ: শিশু সুরক্ষা সম্পর্কিত বিদ্যমান আইনগুলির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক এবং প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করা হোক।

 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুরক্ষা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ এবং সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক।

 

মনিটরিং ও মূল্যায়ন: শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপগুলির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে একটি স্বতন্ত্র মনিটরিং সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা হোক।

 

মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা: নির্যাতিত শিশুদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও পুনর্বাসন সেবা নিশ্চিত করা হোক।

 

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা: সকল নাগরিক, বিশেষ করে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হোক।

 

শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি: ক্ষতিকর সামাজিক রীতি ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার সংস্কৃতি পরিবর্তনে জাতীয় পর্যায়ে প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হোক।

 

ভুক্তভোগীদের সহায়তা: সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী ও সহজপ্রাপ্য করা হোক, যার মধ্যে কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন সেবা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

 

স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা: নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে কমিউনিটি নেতা, শিক্ষক, ও অভিভাবকদের সক্রিয় সংলাপে যুক্ত করা হোক।

 

শিশু হেল্প ডেস্ক: সকল থানায় শিশু হেল্প ডেস্ককে কার্যকর করতে হবে।

 

ঘটনার শিকার ও সাক্ষীর সুরক্ষা: সহিংসতার শিকার শিশু, শিশুর পরিবার ও ঘটনার সাক্ষীদের জন্য সুরক্ষা আইনগত ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক। পমিনহমজৃ।

 

হটলাইনকে কার্যকর ও করা: ১০৯ ও ১০৯৮ নম্বরে আসা অভিযোগ এবং তার পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জবাবদিহিতা মূলক নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করা হোক।

 

একটি কার্যকর হটলাইন: নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২৪/৭ নতুন হটলাইন চালু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। ০১৩২০-০০২০০১, ০১৩২০-০০২০০২ ও ০১৩২০-০০২২২২। একাধিক হটলাইনের পরিবর্তে বিদ্যমান নম্বরগুলিকে আরও কার্যকর করে বিভ্রান্তি এবং অস্পষ্টতা হ্রাস করা যায় কিনা তা বিবেচনা করা হোক।

 

UNCRC পর্যায়ক্রমিক রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদন উপস্থাপন: জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের (UNCRC) অধীনে ষষ্ঠও সপ্তম পর্যায়ক্রমিক রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদন উপস্থাপন করার মাধ্যমে শিশুঅধিকার সুরক্ষা, উন্নয়ন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

 

আমাদের কন্যা শিশুদের নিরাপত্তা ও সুস্থতা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাদের নির্ভয়ে বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। আসুন, আমরা একত্রিত হয়ে মেয়ে শিশুদের প্রতি সহিংসতা নির্মূল করি এবং সমতা, সম্মান ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সমাজ গড়ে তুলি।

অর্থআদালতডটকম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবহার হতে বিরত থাকুন।

শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় শিশু অধিকার বিষয়ক এনজিওদের প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ

আপডেটঃ ০৩:১৪:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ মার্চ ২০২৫

আমরা, শিশু সুরক্ষা ও শিশু অধিকার নিয়ে কর্মরত জাতীয় ও আন্তজাতিক বেসরকারি সংস্থাসমূহ আজ একসাথে হয়েছি আপনাদের সাথে আমাদের গভীর উদ্বেগ ভাগাভাগি করে নিতে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক যৌন সহিংসতা, নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা বা হত্যা চেষ্টা আমাদের ভীষনভাবে দুঃখ ভারাক্রান্ত ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই সংকট শুধু শিশুদের জীবনকেই ধ্বংস করছে না, বরং আমাদের সমাজের মূল ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। বাংলাদেশে মেয়েশিশুদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা এই সহিংসতা জাতিকে হতবাক করেছে এবং সারাদেশে প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। দেশব্যাপী প্রতিবাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে আজ আমরাও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

 

আজ রোববার (১৬ মার্চ) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাসমূহ সংবাদ সম্মেলন করেন।

 

এ পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের গভীর উদ্বেগের পাশাপাশি, আমরা সরকারের কাছে কিছু দাবি উপস্থাপন করতে চাই, যা আমরা আশা করি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হবে এবং সরকার অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

 

বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য সরকারের কাছে একাধিকবার দাবী জানানো হয়েছে। অপরাধীরা প্রায়শই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়েযেতে সক্ষম হওয়ায় তারা পুনর্বার নির্যাতনে লিপ্ত হতে থাকে। এর সবচেয়ে মর্মান্তিক উদাহরণ হলো ২০১৬ সালে ৫ বছর বয়সী একটি শিশুকে নির্মমভাবে ধর্ষণের দায়ে কয়েক বছর আগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন অপরাধীর সাম্প্রতিক জামিন।

 

মাগুরায় ৮ বছর বয়সী শিশুর সাম্প্রতিক নির্মম ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ করে যে, জনপরিসরে, নিকট আত্মীয় এমনকি নিজের বাড়িতেও নিরাপদ নয় শিশুরা। যদিও অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়েছে, তবে আমরা আশু ও যথাযথ তদন্ত, বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবী জানাই।

 

পরিবারের সদস্য এবং নিকট আত্মীয়দের দ্বারা যৌন অসদাচরণের বিষয়ে নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। এই অপরাধীরা নীরবতার একটি সংস্কৃতিতে লালিত হচ্ছে যেখানে নিকট আত্মীয়দের দ্বারা সংঘটিত এমন কর্মকাণ্ড প্রকাশ করা একটি কলঙ্ক বা অসম্মান হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এটি মেয়েশিশুদের পাশাপাশি ছেলেশিশুদের জন্যও একটি বাস্তবতা। যারা অপরাধী তাদের দোষারোপ না করে উল্টো অপরাধের শিকার ব্যক্তিকেই অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়। শিশুদের সুরক্ষা ও সুষ্ঠু বিকাশের মতো এরকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সরকারের কাছে যথাযথ ও প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার পাচ্ছেনা বলেই মনে হচ্ছে।

 

এদিকে, শিশুরা যৌন নির্যাতন, বিপজ্জনক শ্রম, অবহেলা, অনলাইন সহিংসতা এবং অন্যান্য সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। শিশুরা তাদের বাড়িতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, জনসমক্ষে, কোথাও নিরাপদ নয়। শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি কার্যকর বা জবাবদিহিমূলক নয়।

 

শিশু অধিকার বাস্তবায়নে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় যুক্ত থাকলেও শিশুর কল্যাণের বিষয়টি মূলত- মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ তিনটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত। মন্ত্রণালয়গুলো তাদের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মতো শিশুদের জন্য কোনো আলাদা অধিদপ্তর নেই যা শিশুদের সাথে সম্পর্কিত সমস্ত বিষয়ে সমন্বয়কারী সংস্থা হিসাবে কাজ করতে পারে।

 

এধরনের পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মহিলা বিষয়ক সংস্কার কমিশনের মতো ‘শিশু বিষয়ক সংস্কার কমিশন’ প্রতিষ্ঠারও যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস।

 

আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই যে, তারা যেন শিশুদের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করেন। তাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সহায়তা ও সমর্থন প্রয়োজন। আমরা চাই সরকার অনতিবিলম্বে শিশুদের সমস্যাগুলিকে অগ্রাধিকার দিক, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের। বর্তমান পরিস্থিতি জরুরিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি করে, তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ আমাদের সবার উপলব্ধি করা অত্যাবশ্যক যে শিশুর প্রতি যে কোনো নির্যাতন ও সহিংসতা তার মনে এতটাই গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রভাব ফেলে যে তার স্বাভাবিক বিকাশ ও মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, সামাজিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় এবং সুন্দর ভবিষ্যত বিনির্মাণের পথ রুদ্ধ হয়।

 

বর্তমান সংকট মোকাবিলার জন্য কিছু দাবি উপস্থাপন করা হলো। আমরা আশা করি এগুলো পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জরুরিভাবে বিবেচনা করা হবে।

 

আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ সংস্থাসমূহর দাবি:

 

আইনের সংস্কার ও দ্রুত বিচার: শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলাগুলির দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হোক। অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যেন তারা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই আইন উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতির জন্য যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে ধর্ষণের মামলায় তদন্তের সময় ৩০ থেকে কমিয়ে ১৫ দিন করা হচ্ছে। আর বিচার শেষ করতে হবে ৯০ দিনের মধ্যে। সাম্প্রতিক সহিংসতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও বিচার বিষয়ে আইন উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হোক।

 

শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা: শিশুদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মতো একটি শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর স্থাপন করা হোক, যা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করবে।

 

শিশু সংস্কার কমিশন গঠন: শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ক একটি সংস্কার কমিশন জরুরী ভিত্তিতে গঠন করা হোক, যা সকল অংশীজনের সাথে পরামর্শের মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় একটি সুপারিশমালা প্রস্তুত করবে এবং অন্যান্য সংস্কার কমিশনের মতো তা প্রধান উপদেষ্টাকে হস্তান্তর করবে।

 

পারিবারিক সুরক্ষা নিশ্চিত: পরিবারে সদস্য ও নিকট আত্মীয়দের দ্বারা যৌন নির্যাতনের বিষয়ে নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙতে ব্যাপক জনসচেতনতামুলক কর্মসূচিগ্রহণ করা হোক, যেন ভুক্তভোগীরা নিরাপদে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারে।

 

শিশু সুরক্ষা আইন প্রয়োগ: শিশু সুরক্ষা সম্পর্কিত বিদ্যমান আইনগুলির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক এবং প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করা হোক।

 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুরক্ষা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ এবং সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক।

 

মনিটরিং ও মূল্যায়ন: শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপগুলির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে একটি স্বতন্ত্র মনিটরিং সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা হোক।

 

মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা: নির্যাতিত শিশুদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও পুনর্বাসন সেবা নিশ্চিত করা হোক।

 

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা: সকল নাগরিক, বিশেষ করে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হোক।

 

শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি: ক্ষতিকর সামাজিক রীতি ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার সংস্কৃতি পরিবর্তনে জাতীয় পর্যায়ে প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হোক।

 

ভুক্তভোগীদের সহায়তা: সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী ও সহজপ্রাপ্য করা হোক, যার মধ্যে কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন সেবা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

 

স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা: নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে কমিউনিটি নেতা, শিক্ষক, ও অভিভাবকদের সক্রিয় সংলাপে যুক্ত করা হোক।

 

শিশু হেল্প ডেস্ক: সকল থানায় শিশু হেল্প ডেস্ককে কার্যকর করতে হবে।

 

ঘটনার শিকার ও সাক্ষীর সুরক্ষা: সহিংসতার শিকার শিশু, শিশুর পরিবার ও ঘটনার সাক্ষীদের জন্য সুরক্ষা আইনগত ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক। পমিনহমজৃ।

 

হটলাইনকে কার্যকর ও করা: ১০৯ ও ১০৯৮ নম্বরে আসা অভিযোগ এবং তার পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জবাবদিহিতা মূলক নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করা হোক।

 

একটি কার্যকর হটলাইন: নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২৪/৭ নতুন হটলাইন চালু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। ০১৩২০-০০২০০১, ০১৩২০-০০২০০২ ও ০১৩২০-০০২২২২। একাধিক হটলাইনের পরিবর্তে বিদ্যমান নম্বরগুলিকে আরও কার্যকর করে বিভ্রান্তি এবং অস্পষ্টতা হ্রাস করা যায় কিনা তা বিবেচনা করা হোক।

 

UNCRC পর্যায়ক্রমিক রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদন উপস্থাপন: জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের (UNCRC) অধীনে ষষ্ঠও সপ্তম পর্যায়ক্রমিক রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদন উপস্থাপন করার মাধ্যমে শিশুঅধিকার সুরক্ষা, উন্নয়ন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

 

আমাদের কন্যা শিশুদের নিরাপত্তা ও সুস্থতা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাদের নির্ভয়ে বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। আসুন, আমরা একত্রিত হয়ে মেয়ে শিশুদের প্রতি সহিংসতা নির্মূল করি এবং সমতা, সম্মান ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সমাজ গড়ে তুলি।